ওমর ফারুক
স্টাফ রিপোর্টারঃ
ক্ষণ গণনায় বলা যেতে পারে আর মাত্র ৫ মাস। চলতি বছরের জুন মাসে নতুন আলোয় আলোকিত হতে যাচ্ছে দেশের উত্তরাঞ্চল। ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের উচ্চচাপ সম্পূন পাইপলাইনে গ্যাস সুবিধা পাবে ১১টি জেলা। এর মধ্যে রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, জয়পুরহাট, নওগাঁ ও নাটোর।
অপরদিকে এ বছরের জুনেই ভারতের শিলিগুড়ির নুমালীগড় থেকে পাইপলাইনে ডিজেলও আসবে উত্তরাঞ্চলে। পাইপলাইন প্রকল্পটির কাজও দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। এটি বাস্তবায়িত হলে ভারত থেকে পার্বতীপুর রেলহেড ডিপোতে ডিজেল আসতে সময় লাগবে মাত্র কয়েক ঘণ্টা। সেখান থেকে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় তা সরবরাহ করা হবে।
এতে পরিবহন ব্যয় অনেক কমে যাবে। পার্বতীপুর রেলহেড ডিপোর বর্তমান ধারণক্ষমতা ১৫ হাজার টন থেকে ৪৩ হাজার ৮০০ টনে উন্নীত করা হচ্ছে। বর্তমানে আমদানি করা জ্বালানি তেল পার্বতীপুরে পৌঁছতে সময় লাগে প্রায় এক মাস। তাই এবার পাইপলাইনে ডিজেল আমদানির বিকল্প উৎস তৈরি হলো।
উত্তরাঞ্চলবাসীর প্রতীক্ষার প্রহর শেষ হতে চলেছে। চলতি বছরের জুন মাসে আশা করা যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করবেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে বগুড়া থেকে রংপুর হয়ে নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেড পর্যন্ত গ্যাস লাইন সংযোগের কাজ শুরু হয়। ইতোমধ্যে পাইপলাইন স্থাপনের কাজ প্রায় শেষ। নির্মাণ চলছে সিজিএস-টিবিএস ও রিভার ক্রসিং লাইন স্থাপনের কাজ। প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার এ মেগাপ্রকল্পের কাজ ২০২১ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য ছিল।পরে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হলেও ২০২৩ সালের জুন মাসে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ শুরু করা হবে। জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের আওতাধীন পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (পিজিসিএল) এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড সূত্রে জানা যায়, বগুড়া পর্যন্ত পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ চালু রয়েছে। এখন বগুড়া থেকে রংপুর হয়ে নীলফামারীর সৈয়দপুর পর্যন্ত ১৪৭ দশমিক ৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের সঞ্চালন লাইন বসানো শেষ হয়েছে।পাইপ লাইনের রুটম্যাপ অনুযায়ী অধিগ্রহণ করা জমিতে সঞ্চালন লাইন পাইপ, ইন্ডাকশন বেন্ড, কোটিং ম্যাটেরিয়ালস, ফিটিংস, পিগ ট্রাপ, বল ভাল, গেট ভাল,সহ বিভিন্ন সরঞ্জাম সংযোগ করা হচ্ছে। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান পাইপ জোড়া লাগানোসহ ভূমি উন্নয়নের কাজ সম্পূর্ন করেছে। পাইপ লাইনের শেষপ্রান্ত নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের ওয়াপদা মোড়ের বাইপাস সড়ক সংলগ্ন তিন একর জায়গায় স্থাপন করা হচ্ছে ১০০ এমএমএসসিএফডি (মিলিয়ন স্ট্যান্ডার্ড কিউবিক ফিট পার ডে) ক্ষমতাসম্পন্ন সেন্ট্রাল গ্যাস সাপ্লাই (সিজিএস) স্টেশন। এ ছাড়া এ প্রকল্পের আওতায় রংপুরে ৫০ এমএমএসসিএফডি ক্ষমতাসম্পন্ন একটি টিবিএস (টাউন বর্ডার স্টেশন)
এবং রংপুরের পীরগঞ্জ পৌরসভা ৩ নং ওয়াডের নিয়ামতপুর মৌজার মধ্যে ২০ এমএমএসসিএফডি ক্ষমতাসম্পন্ন একটি টিবিএস স্থাপন করা হচ্ছে বলে জানান, প্রকল্প পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার আরিফুল ইসলাম। তিনি আরও জানান, এ বছরের জুনেই ৩০ ইঞ্চি ব্যাসের উচ্চচাপ সম্পূন এই পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস পৌঁছে যাবে উত্তরাঞ্চলের ১১ জেলায়।
নীলফামারী চেম্বর অব কমার্সের সভাপতি ইঞ্জি. সফিকুল আলম বলেন, পাইপলাইনে গ্যাসসরবরাহ শুরু হলে গ্যাস সংযোগকে কেন্দ্র করে উত্তরাঞ্চলে গড়ে উঠবে শিল্পকারখানা, ইপিজেড, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য হিমাগার। বাড়বে কর্মসংস্থান। সমৃদ্ধ হবে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান তথা বাংলাদেশের অর্থনীতি। তিনি জানান, ইতোমধ্যে বিভিন্ন শিল্পপতিরা এ অঞ্চলের শিল্পকারখানা গড়ে তোলার কাজ শুরু করে দিয়েছে।
এদিকে ভারত থেকে চলতি জুনেই পাইপলাইনে ডিজেল আসবে বাংলাদেশে। পাইপলাইনে আসার কারণে দেশে জ্বালানি সরবরাহ বাড়বে এবং জ্বালানি পরিবহনের খরচ কমে আসবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সূত্র জানায়, এরই মধ্যে বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী পাইপলাইন স্থাপনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ভারতের শিলিগুড়িতে চলছে ডিজেল সরবরাহের প্রস্তুতি। পাইপ লাইনের মাধ্যমে ভারত থেকে ডিজেল আমদানির জন্য ভারত অংশে ৫ কিলোমিটার ও বাংলাদেশে অংশে ১৩১ দশমিক ৫ কি.মি পাইপলাইন স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে।পাইপলাইন স্থাপন করা হয় বাংলাদেশ অংশের তেঁতুলিয়া উপজেলার বাংলাবান্ধা থেকে পঞ্চগড় সদর, দেবীগঞ্জ, নীলফামারী সদর, দিনাজপুরের খানসামা এবং চিরিরবন্দর ও নীলফামারীর সৈয়দপুর হয়ে দিনাজপুরের পার্বতীপুর পর্যন্ত।
বিপিসির পক্ষে মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড (এমপিএল) ও ভারতের নুমালীগড় রিফাইনারি লিমিটেড (এনআরএল) যৌথভাবে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন স্থাপন নামের এই প্রকল্পের পরিচালক টিপু সুলতান বলেন, পাইপলাইনের ফিনিশিং পর্যায়ের কাজ চলছে। আশা করছি, জুনের আগেই মেকানিক্যাল কমিশন এবং অপারেশনাল কমিশনিং শেষ হলে তা ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হবে।
সুত্র মতে দেশে জ্বালানি তেলের চাহিদার প্রায় ৭৫ শতাংশই ডিজেল। বছরে ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৪৬ লাখ টন, যার ৮০ শতাংশই সরকার সরাসরি আমদানি করে।
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। আর পরিশোধিত তেল আমদানি করা হচ্ছে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, আরব আমিরাত, কুয়েত, থাইল্যান্ড ও ভারত থেকে।তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানির বাজারে অস্থিরতা চলছে। এ অবস্থায় আগামী জুনের শুরুর দিকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারত থেকে ডিজেল আনা সম্ভব হবে। পাইপালাইনের মাধ্যমে ডিজেল আসলে পরিবহন ব্যয় ও সময় দুটোয় সাশ্রয় হবে।
বিপিসি সুত্র মতে , জ্বালানি তেল আনার ক্ষেত্রে প্রতি ব্যারেলে (১৫৯ লিটার) গড়ে ১০ ডলার প্রিমিয়াম (জাহাজভাড়াসহ অন্য খরচ) দিতে হয় বিপিসিকে। ভারত থেকে আনার ক্ষেত্রে এটি আট ডলার হতে পারে। প্রতি ব্যারেলে দুই ডলার কমলে প্রতি এক লাখ টনে প্রায় ১৫ লাখ ডলার সাশ্রয় করা সম্ভব।

