
লিখেছেন ডাঃ মারুফা আক্তার :
আমাদের আশেপাশে অনেকেই উচ্চ রক্তচাপ জনিত রোগে ভুগছে। এটি খুবই পরিচিত রোগে পরিণত হয়েছে এখন। সময়মতো রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা না করা হলে, উচ্চ রক্তচাপ হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের মত মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। অনেক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি উচ্চ রক্তচাপে ভুগলেও তারা সেই সম্পর্কে অবগত থাকেন না। উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত প্রায় অর্ধেক রোগীই জানেন না যে তারা এ রোগে ভুগছেন, গবেষণায় উঠে এসেছে এমন সব তথ্য। অথবা জানলেও অনেকে ভুল ধারণা মনে নিয়ে দিন পার করেন! রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সময়মতো যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে এই ঝুঁকি দিন দিন বাড়তেই থাকে। হুট করেই রক্তচাপ বেড়ে গেলে করণীয় কী, সেটাই জানবো আজকের ফিচারে।
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে খাবারে লবণের মাত্রা হিসেব করা খুবই জরুরি। অনেক সময় না জেনেই আমরা লবণযুক্ত এমন অনেক খাবার খাই যার ফলে রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। চলুন জেনে নেই তাহলে-
১) ভাতের সাথে অতিরিক্ত লবণ, শুঁটকি বা নোনা ইলিশের শুঁটকি, সয়া সস ও ফিস সসযুক্ত রেস্টুরেন্ট এর খাবার, ফ্রোজেন মিট যেমন সসেজ ও মিট বল, রেডিমেড স্যুপ, পান্তা ভাত ইত্যাদি।
২) লবণযুক্ত স্ন্যাকস বা নাস্তা- ইনস্ট্যান্ট নুডলস, পাস্তা, চটপটি, অতি মাত্রায় বিট লবণ ও চাট মসলা যুক্ত ফুচকা, লবণযুক্ত বাদাম, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, অন্যান্য ফাস্ট ফুডস, চিপস, কুকিস, নিমকি, চানাচুর, পপকর্ন, বিভিন্ন রকম প্রসেসড ফুড যেমন ডালপুরি, সিঙ্গারা, নাগেটস ইত্যাদি।
৩) উচ্চমাত্রায় লবণযুক্ত পানীয়- বোরহানী, জিরা পানি, ঘোল, লাবাং বা মাঠা।
৪) এছাড়াও ফল লবণ দিয়ে খাওয়া, রেডিমেড মসলা, আচার, চাটনি, মেয়োনিজ, টমেটো সস, সয়া সস, বারবিকিউ সস, সালাদ ড্রেসিং ইত্যাদি উচ্চ রক্তচাপের কারণ হতে পারে।
অতিরিক্ত ওজন হ্রাস এবং কোমর বা পেটের বাড়তি চর্বি কমানোর মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে ফেলা যায়। প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষদের জন্য কোমরের মাপ যদি ৪০ ইঞ্চির বেশি হয় এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে যদি কোমরের মাপ ৩৫ ইঞ্চির বেশি হয় তবে তারা উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকিতে আছে বলে ধরা হয়।
নিয়মিত ব্যায়াম করলে প্রায় ৫ থেকে ৮ মি.মি./মার্কারি উচ্চ রক্তচাপ কমানো যায়। তাই নিয়মিত ব্যায়াম করে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। বিগেইনার হিসেবে প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হালকা ব্যায়াম করা উচিত। আউটডোর এক্সারসাইজ করতে চাইলে হাঁটাহাঁটি, জগিং, সাইক্লিং, সাঁতার কাটা ইত্যাদি বেশ ভালো অপশন। বাইরে যেতে না পারলে ঘরেই ব্যায়াম করে নিতে পারেন। এই লাইট ওয়ার্ক আউট আপনাকে ফিট থাকতে হেল্প করবে।
স্বাস্থ্যসম্মত খাবার তালিকা বা হেলদি ডায়েট মেনে চললে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। শস্য জাতীয় খাবার, ফল, শাক সবজি, কম চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবার, লো স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা কোলেস্টেরল সমৃদ্ধ খাবার উচ্চ রক্তচাপকে ১১ মি.মি./মার্কারি পর্যন্ত কমাতে পারে। এছাড়াও খাদ্যে থাকা পটাশিয়াম রক্তচাপের উপর লবণের (সোডিয়াম) প্রভাব কমাতে পারে। পটাশিয়ামের সর্বোত্তম উৎস হলো ফল, শাক সবজি।
মদ্যপানের অভ্যাস থাকলে সেটি ত্যাগ করতে হবে। ধূমপানের অভ্যাস থাকলে সেটিও একদম বাদ দিতে হবে। ধূমপান বন্ধ করলে তা উচ্চ রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করবে। এটি হৃদরোগের ঝুঁকিও কমাতে পারে। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে আপনি সুস্থ থাকবেন।
খাদ্য তালিকায় লবণের (সোডিয়াম) পরিমাণ কমিয়ে ফেলুন। কাঁচা লবণ না খাওয়াই ভালো। খাদ্যে সোডিয়ামের সামান্য হ্রাসও হৃদরোগের উন্নতি করতে পারে এবং উচ্চ রক্তচাপ প্রায় ৫ থেকে ৬ মি.মি./মার্কারি কমাতে পারে। একজন প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তি প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১ চা চামচ আয়োডিনযুক্ত লবণ খেতে পারবে (সারা দিনের সব খাবার মিলিয়ে)।

সুস্থ থাকতে হলে নিয়মিত পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুমাতে হবে। কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতি রাতে ৬ ঘন্টার কম ঘুমালে উচ্চ রক্তচাপ দেখা দিতে পারে। স্লিপ অ্যাপনিয়া বা স্লিপিং ডিজঅর্ডার, ইনসমনিয়া, সাধারণ নিদ্রাহীনতা, দুশ্চিন্তা ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে। এসব সমস্যার কোনোটিতে ভুগে থাকলে তা চিহ্নিত করে নির্মূল করার ব্যবস্থা নিতে হবে। ডাক্তার যদি ঘুমের জন্য মেডিসিন দেন, তাহলে সেটা নির্দিষ্ট ডোজে খেতে হবে।
হাই ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণের জন্য সব ধরনের দুশ্চিন্তা থেকে দূরে থাকতে হবে। দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের ফলে উচ্চ রক্তচাপ দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত কাজের প্রেশার, আর্থিক অবস্থার অবনতি, পারিবারিক কলহ বা অসুস্থতা ইত্যাদি উচ্চ রক্তচাপের কারণ হতে পারে। শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে হলে দুশ্চিন্তা বা মানসিক চাপের কারণ কী তা খুঁজে বের করতে হবে এবং আগে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে।

হাই ব্লাড প্রেশারের রোগীর রক্তচাপ নিয়মিত মনিটর করতে হবে এবং যেকোনো শারীরিক অসুস্থতায় দ্রুত চেকআপ করাতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না, মানসিক সুস্থতার জন্য ফ্যামিলি এনভায়রনমেন্ট শান্তিময় হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। হাই প্রেশারের রোগী ঠিকমতো মেডিসিন খাচ্ছে কিনা, হেলদি ফুডচার্ট মেনে চলছে কিনা; সেটা পরিবারের সদস্যদেরও খেয়াল রাখা উচিত।

অনেকে প্রেশার বাড়লে তেঁতুলের শরবত খায়, চিকিৎসা শাস্ত্রে এই নিয়ে কোনো নীতিমালা নেই। তবে তেঁতুলে থাকা অ্যাসিড রক্তকে কিছুটা লঘু করে এবং এতে ব্লাড প্রেশার কমে। তেঁতুলে পটাশিয়াম থাকায় তা উচ্চ রক্তচাপ কমিয়ে আনতে কিছুটা ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এটা কোনো স্থায়ী সমাধান দেয় না, তাই চিকিৎসকের পরামর্শে যথাযথভাবে মেডিসিন নিতে হবে।
হুট করেই রক্তচাপ বেড়ে গেলে কী কী করা উচিত, সেগুলো আমাদের জানা হয়ে গেলো। জীবনধারায় কিছু স্বাস্থ্যকর পরিবর্তন আনলে সেটা উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমায়। এছাড়া ইতোমধ্যে উচ্চ রক্তচাপ হয়ে থাকলে সেটি নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা করে। বিভিন্ন রোগীর রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি কার্যকর হতে পারে। আপনার জন্য কোন পদ্ধতিটি সবচেয়ে উপযুক্ত তা জানতে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
সম্পাদক- আবদুর রহমান
Web:https://bangladeshamar.com/ Email: doinikbangladeshamar@gmail.com
Address: F-8, KA-90,JHK WINDCEL, KURIL KAZI BARI,VATARA,DHAKA-1229.
Copyright © 2026 বাংলাদেশ আমার. All rights reserved.