সম্পাদক

নিউজ ডেস্ক:

ডলার নিয়ে বাংলাদেশে অনেকটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি চলছে বলে অভিযোগ। যদিও রোববার নতুন মুদ্রানীতিতে ডলারর দাম বাজারের উপর ছেড়ে দেয়ার কথা বলা হয়েছে।

চড়া দামে ডলার বিক্রির অভিযোগে গত বছরের আগষ্টে ছয়টি ব্যাংককে চিহ্নিত করেছিলো বাংলাদেশ ব্যাংক। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিলো যে তারা ডলারের প্রচলিত রেটের চেয়ে বেশি দামে ডলার বিক্রি করে লাভবান হচ্ছিলো।

এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থাও নেয়া হয়। এরপর সর্বশেষ এফবিসিসিআইর সভাপতি মো. জসিমউদ্দিন ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে অভিযোগ করেন, “ডলার বিনিময় হারের নামে ব্যাংকগুলো লুটাপাট চালাচ্ছে। তার কথায়,” ডলারের দাম বাড়িয়ে লুটের মালের মতো প্রতি ডলারে ১১৪-১১৫ টাকা রাখছে।”

ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ডলার সংকট দেখা দেয়ায় তা মোকাবেলায় বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের বিভিন্ন রেট করে দেয়। এখন আমদানিতে প্রতি ডলার ১০৬, রপ্তানিতে ১০৭ এবং প্রবাসী আয়ে ১০৮.৫ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে ১০৬ টাকা দরে ডলার বিক্রি করছে।

বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে জানা গিয়েছে, বাস্তবে আমদানিকারকরা এই রেটে ব্যাংক থেকে ডলার পাচ্ছেন না। ডলার সংকটের কারণে এলসির চাহিদার বিপরীতে পর্যাপ্ত ডলার নেই। এই সুযোগ নিচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। তারা বেশি দামে ডলার বিক্রি করছে। কারণ তারা ডলারের চাহিদা মিটাতে ভিন্ন উৎস থেকেও ডলার সংগ্রহ করে।  ব্যাংকগুলো ১১৪-১৫ টাকায় ডলার বিক্রি করছে। আর কার্ব মার্কেটে এই ডলারের দাম ১১৭-১১৮ টাকা।

ডলার সংকটের কারণে যারা ছোট ব্যবসায়ী তারা এলসি খুলতে পারছেন না। কয়েকজন ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, এলসি খুলতে না পেরে তাদের ব্যবসা বন্ধের পথে। কারণ ব্যাংকগুলো বড় ব্যবসায়ী ও বিশেষ সুবিধা না পেলে ডলার দেয় না। আমাদের পক্ষে সেটা সম্ভব হয়না। অনেক সময় ব্যংক ডলারের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংকে জমা রাখার শর্ত জুড়ে দেয়।

জানা গেছে ব্যাংক ও ব্যবসায়ী দুই পক্ষই  ওয়ান টু ওয়ান সমঝোতার ভিত্তিতে ডলার দাম নির্ধারণ করে। আবার কেনো কোনো ব্যবসায়ীর অনুরোধে তারা নানা উৎস থেকে বেশি দামে ডলার সংগ্রহ হরে তার উপর লাভ হিসাব করে বিক্রি করে। ফলে ডলারের দাম আসলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারতি হারের মধ্যে নাই।

যমুনা ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নুরুল আমিন বলেন,” আসলে ডলারের বাজারে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার অভাব দেখা দিয়েছে। ডলারের চাহিদা বেশি কিন্তু সরবরাহ কম। ফলে কোনো কোনো ব্যাংক এর সুবিধা নিচ্ছে। আর একই ডলারের ভিন্ন ভিন্ন রেটও এক ধরনের বিশৃঙ্খলা বা অস্বচ্ছতা তৈরি করেছে। প্রবাসী আয়ের রেট বেশি। রপ্তানি আয়ের কম। তাহলে রপ্তানি আয়ের ডলার কি খারাপ?”

তিনি বলেন,” বড় ব্যবসায়ীরা ছাড়া ছোট ব্যবসায়ীরা তো এখন ডলার পান না। তাদের ব্যবসাও চলছেনা। বড় ব্যবসায়ীরা তাদের সম্পর্ক এবং প্রভাবে ডলার পাচ্ছে। আর রেট আসলে তারাই নির্ধারণ করে নিচ্ছে। বেশি রেটে ডলার কিনে পণ্য আমদানি করায় মূল্যস্ফীতি বাড়ছে।”

তার কথা,” দেশ থেকে টাকা পাচার হওয়ার কারণেও ডলারের দাম বাড়ছে। কারণ তাদের কাছে ডলারের রেট কোনো বিষয় নয়। তারা ১৩০ টাকা রেটেও ডলার কিনছে।”

পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক এবং ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন,”ডলারের ভিন্ন ভিন্ন রেট থাকা উচিত না। এটা বাজারের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। ফলে বিভিন্ন খাতে ডলারের দামের পার্থক্য যে কিছুটা হবেনা তা নয়। যা হবে তা যৌক্তিক।”

তার মতে,” মূল সমস্যা হচ্ছে ডলারের সংকট। আর ব্যাংকগুলো তার সুযোগ নিচ্ছে। অর্থ পাচারকারীরাও ডলারের সংকট তৈরি করছে। বাংলাদেশ ব্যাংক যে ডলার বিক্রি করছে সেটাও অনুচিত। এর কারণে রিজার্ভ আরো কমে যাবে।”

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক রবিবার নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার বলেছেন,” ডলারের ভিন্ন ভিন্ন রেট আর থাকবেনা। বাজারের ওপর ডলারের রেট ছেড়ে দেয়া হবে।”

ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন এটা যত দ্রুত কার্যকর হয় ততই ভালো। আর মো. নুরুল আমিন বলেন, “গত আগস্টে ব্যাংকগুলোর বেশি দামে ডলার বিক্রি করার ঘটনা প্রকাশ পায়। তারপর আরো কোনো ব্যবস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক নেয়নি। ফলে পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে।”