ওমর ফারুক

মঞ্জুরুল আলম, স্পোর্টস ডেস্ক :

তিনি জিম্বাবুয়ের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ অধিনায়ক মাত্র ১৮ বছর বয়সে টেস্ট দলে অভিষেক, ১৯ বছর বয়সে সহ-অধিনায়ক এবং ২০ বছর বয়সে হন ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ টেস্ট অধিনায়ক। ২০১৯ সালে মাত্র ৮ দিন কম বয়সে আফগানিস্তানের রশীদ খান এই রেকর্ড ভেঙে দেন।

ফুটবলকে ক্রিকেটের চাইতে বেশি ভালোবাসলেও শৈশবের এক বন্ধুর আগ্রহে তার ক্রিকেটের সাথে পরিচয়।বাবার মৃত্যু তাকে স্কুলে স্কলারশিপ পাওয়ার উদ্দেশ্যে ক্রিকেট খেলতে বাধ্য করে।

যদিও তার ইচ্ছা ছিল ইগলস ভেইল স্কুলে ভর্তি হওয়া। কিন্তু তার বাবার মৃত্যুর পর এত বড় পরিবার নিয়ে মায়ের কষ্ট অনুধাবন করে তিনি তার সম্পূর্ণ মনোযোগ দেন ক্রিকেটে, এবং অবশেষে চার্চিল স্কুলে স্কলারশিপ পান তিনি
জেনে অবাক হবেন উইকেট কিপার হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত তাইবু অলরাউন্ডার হিসেবে ক্রিকেটে যাত্রা শুরু করেন, যেখানে ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি অফ স্পিন বোলিং করতেন তিনি।
একদিন তার দলের উইকেটরক্ষক মাঠে উপস্থিত না থাকায় গ্লাভস হাতে উইকেটের পেছনে দাঁড়ান।সেদিন থেকেই সে কিপার হয়ে যায়।

মাত্র ১৬ বছর বয়সে শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের স্কোয়াডেও যুক্ত হন। সেই বিশ্বকাপে দু’টি ফিফটির মাধ্যমে নিজের আগমনের জানান দেন।
নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত পরবর্তী অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে ব্যাট হাতে ৫০ গড়ে ২৫০ রান করার পাশাপাশি বল হাতে তুলে নেন ১২ টি উইকেট।
এমনকি উইকেটের পিছনে দাঁড়িয়ে লুফে নেন ৫টি ক্যাচ। অধিনায়ক টাইবু সেই বিশ্বকাপে অসাধারণ অলরাউন্ড নৈপুণ্যে হন ম্যান অফ দ্য টুর্নামেন্ট।

বিশ্বের যে অল্প কজন প্রতিভাবান ক্রিকেটার প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ খেলার আগেই জাতীয় দলে সরাসরি সুযোগ পেয়েছিলেন টাটেন্ডা তাইবু তাদের মধ্যে অন্যতম।
তাকে অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারের উত্তরসূরি ভাবা হতো।ব্রায়ান লারা, কোর্টলি অ্যামব্রোসের মতো ক্রিকেটাররা তার প্রশংসা করেছিলেন।

কিন্তু সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায় নোংরা রাজনীতির কারণে। যিনি দেশের হয়ে অন্তত ২০ বছর ক্রিকেট খেলার স্বপ্ন দেখেছিলেন,সেরাদের একজন হতে চেয়েছিলেন, সেই টাইবুকে মাত্র ২২ বছর বয়সে ছাড়তে হয়েছে অধিনায়কত্ব,ছাড়তে হয়েছে ক্রিকেট, ছাড়তে হয়েছে নিজ দেশ।

দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় তৎকালীন অধিনায়ক হিথ স্ট্রিক,গ্রান্ট ফ্লাওয়ার সহ সকল তারকা ক্রিকেটারের ক্রিকেট ক্যারিয়ার শেষ করে দেয় মুগাবে সরকার। শক্তিশালী দলটি রাতারাতি দুর্বল হয়ে যায়,
টেস্ট ক্রিকেট থেকে দলটিকে নিষিদ্ধ করে আইসিসি,

এরপর টাটেন্ডা টাইবুকে অধিনায়ক করা হয়,
নীতিতে অবিচল টাইবুও দুর্নীতির বিরুদ্ধে গর্জে উঠেন,
বোর্ডের বিভিন্ন দায়িত্বে থাকা প্রেসিডেন্টের লোকেরা ছিলেন দুর্নীতিগ্রস্ত,যারা আইসিসি থেকে প্রাপ্ত অর্থ ক্রিকেটারদের না দিয়ে লুট করছিলেন, তাইবু চেয়েছিলেন সেসব দুর্নীতি বন্ধ হোক।ক্রিকেটারদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিবাদ করলেন,বোর্ডের চুক্তি সংশোধনের প্রস্তাব দিলেন,

কিন্তু এরপর তার স্ত্রীকে টেলিফোনে মৃত্যুর হুমকি দেয়া হয়, তার স্ত্রীকে অপহরণের চেষ্টা করা হয়,
ফলে বহু ক্রিকেটার জীবন বাচাতে চুক্তিবদ্ধ হয়।
এসব কারণে মাত্র ২২ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেন টাইবু,

মুখ বন্ধ করার জন্য প্রথমেই তাকে শ্বেতাঙ্গদের থেকে দখল করা ফার্মহাউজ,জমির মতো লোভনীয় প্রস্তাব দেয়া হয়,না মানায় সরাসরি মৃত্যুর হুমকি দেয়া হয়।
এইসব ঘটনা তাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে।
দেশ ছেড়ে তিনি প্রথমেই আসেন বাংলাদেশে।চেয়েছিলেন বাংলাদেশের হয়ে খেলতে। সে স্বপ্ন পূরন না হওয়ায় এরপর তিনি ইংল্যান্ড হয়ে নামিবিয়া যান। তারপর চলে যান দক্ষিন আফ্রিকায়,
দুই বছর পর স্পন্সরদের অনুরোধে অবসর ভেঙ্গে জিম্বাবুয়েতে ফিরে এসে জাতীয় দলে যোগ দেন টাইবু।
২০১১ সালে জিম্বাবুয়ে টেস্ট নির্বাসন থেকে ফেরার পর ৪ টি টেস্ট খেলেন তাইবু,এরপর একেবারেই অবসর নেন তিনি।

২৮ ম্যাচের টেস্ট ক্যারিয়ারে ৩০ গড়ে ১,৫৪৬ রান করেন তিনি, এর মধ্যে বাংলাদেশের বিপক্ষে এক সিরিজে পরপর ৩ ইনিংসে করেন ৯২,৮৫,১৫৩ রান!!
১৩৭ টি ওডিআই ইনিংসে ২ সেঞ্চুরি ২২ ফিফটিতে ২৯.২৫ গড়ে করেন ৩,৩৯৩ রান। ১৫ টি T20 ইনিংসে ২৮ গড়ে করেন ২৫৯ রান,

ছোট্ট এই পরিসংখ্যানে কখনোই প্রকাশ পাবেনা কতটা সম্ভাবনাময় ছিলেন টাটেন্ডা টাইবু,
কখনোই প্রকাশ পাবেনা ক্যারিয়ারের অধিকাংশ সময় মৃত্যু ভয়,দুর্নীতি-বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়ে দেশত্যাগ করে এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরতে থাকা টাইবু কত বড় মানের ক্রিকেটার ছিলেন। বর্নবাদ ,নোংরা রাজনীতি,আইসিসি নিষেধাজ্ঞার চাপে পিশে যাওয়ার অন্যতম বড় উদাহরণ তিনি।

বিনম্র শ্রদ্ধা প্রিয় টাটেন্ডা টাইবু তাতেন্দা তাইবু
বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের বিকেএসপির কোচ,তিনি এখন চান তার ছেলে বাংলাদেশের হয়ে খেলুক।