সম্পাদক

বিজয় কর রতন, মিঠামইন (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি:

করিমগঞ্জ ও তাড়াইল উপজেলা নিয়ে গঠিত কিশোরগঞ্জ-৩ আসনটি পরিচিত আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবে। কিন্তু জোটগত সমীকরণের সূত্রে আসনটি দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পার্টির (জাপা) দখলে। দলটির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু এখন এ আসনের সংসদ সদস্য।

২০০৮ থেকে টানা তিনটি নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালেও তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে ২০০৮ সাল থেকে তিনি মহাজোটের প্রার্থী হওয়ায় এ আসনে আলাদা করে প্রার্থী দেয়নি আওয়ামী লীগ। দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনেও এ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন চুন্নু।

এবারও জোটগত নির্বাচন হলে নিশ্চিতভাবেই মনোনয়ন পাবেন তিনি। জাতীয় পার্টি এককভাবে ভোটে গেলেও চুন্নুর প্রার্থিতা প্রায় চূড়ান্ত। বিগত তিনটি নির্বাচনের মতো এবার আর জাতীয় পার্টিকে এ আসনে ছাড় দিতে চান না আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা। এ আসনে নৌকার প্রার্থী ফেরাতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চালাচ্ছেন আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রগতিশীল সব পক্ষ।

১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন ড. মিজানুল হক। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা বলছেন, করিমগঞ্জ উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন, একটি পৌরসভা এবং তাড়াইল উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন নিয়ে এ আসন গঠিত। প্রতিটি ইউনিটেই আওয়ামী লীগ অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে।

তারপরও আগামী নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী না দিলে এ আসনে অস্তিত্বের সংকটে পড়বে আওয়ামী লীগ। আপাতত সরকারবিরোধী আন্দোলনে ব্যস্ত বিএনপির নেতাকর্মীরা এখনই নির্বাচন নিয়ে মুখ খুলছেন না। তবে দলটির নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দলীয় প্রার্থী নিয়ে খুব একটা স্বস্তিতে নেই তারা।

এ আসনে মাত্র দুবার জয়ের মুখ দেখেছেন বিএনপির প্রার্থী। তার মধ্যে একটি জয় আবার ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনে। এ ছাড়া ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে এ আসন থেকে এমপি হয়েছিলেন ড. এম ওসমান ফারুক। বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন সরকারে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন বর্তমানে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান পদে থাকা এই নেতা। তবে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠার পর ২০১৬ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। এরপর থেকে সেখানেই আছেন।

তার অবর্তমানে ২০১৮ সালের নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে এ আসনে ধানের শীষ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) ড. মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম। তবে শেষ পর্যন্ত বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশ নিলে ওসমান ফারুককেই ফের প্রার্থী হিসেবে পেতে চান দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীরা।

এদিকে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই আসনের প্রতিটি এলাকায় আওয়ামী লীগের শক্ত অবস্থান থাকার পরও দলীয় এমপি না থাকায় নেতাকর্মীরা চরমভাবে উপেক্ষিত হচ্ছেন। আবার দলের একটি অংশ বিভিন্ন সুবিধা পেতে জাতীয় পার্টির এমপির সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যেই উপদল গড়ে তুলেছেন। এতে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বাড়ছে।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে জাতীয় পার্টিকে এ আসনে ছাড় না দেওয়ার দাবিতে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করেছেন। আগামী নির্বাচন কেন্দ্র করে এখনও তেমন কোনো তৎপরতা দেখা না গেলেও আওয়ামী লীগের একঝাঁক মনোনয়নপ্রত্যাশী ব্যাপক তোড়জোড় চালাচ্ছেন।

সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তাদের মধ্যে রয়েছেন করিমগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ও উপজেলা চেয়ারম্যান নাসিরুল ইসলাম খান আওলাদ, জেলা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. মাহবুব ইকবাল, করিমগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মো. এমরান আলী ভূঁইয়া, প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অধ্যক্ষ ও জেলা বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি ডা. আ. ন. ম. নৌশাদ খান, বাংলাদেশ স্টিল মিলস স্কেল রি-প্রসেস অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. এরশাদ উদ্দিন, বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডের সাবেক সদস্য সচিব আসাদুল হক, জেলা আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের মোজাম্মেল হক মাখন, স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় শ্রমবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার মুহাম্মদ গোলাম কবির ভূঁইয়া, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক এডিসি মেজর (অব.) মো. নাসিমুল হক, সর্ব ইউরোপীয় বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ড. আনিছুর রহমান আনিছ, আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়াবিষয়ক কেন্দ্রীয় উপকমিটির সদস্য আমিরুল ইসলাম খান বাবলু, নিউইয়র্ক মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ মাহফুজুল হক হায়দার, জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমদ প্রমুখ।

তবে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নাসিরুল ইসলাম খান আওলাদ এগিয়ে থাকবেন বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা। ২০১৪ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নও পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু জোটগত সমীকরণের কারণে শেষ পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে তিনি মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন। ২০১৮ সালেও দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জাপাকে ছাড় দিতে হয়েছে তাকে। পরে ২০১৯ সালে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পান তিনি। সজ্জন ও দানশীল হিসেবে এলাকায় পরিচিতি রয়েছে তার। নেতাকর্মীরাও তাকে ঘিরে উজ্জীবিত।

আগামী নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দলের জন্য পরিশ্রম করছি। আমার বিশ্বাস, দল আমাকে মূল্যায়ন করবে। দীর্ঘদিন ধরে জনসংযোগ করার কারণে নেতাকর্মীদের সঙ্গে আমার সুম্পর্ক রয়েছে, এলাকার জনমতও আমার পক্ষে। সম্ভাব্য অন্য প্রার্থীদের মধ্যে শিল্পপতি এরশাদ উদ্দীন এলাকার তরুণ ভোটারদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। ইতিবাচক ও মানবিক নানা উদ্যোগে সব সময়ই দেখা মেলে তার। দলের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের বিপদে-আপদে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে পিছপা হন না তিনি। নিজের নামে মানবকল্যাণ ফাউন্ডেশন গঠন করে আর্তমানবতার সেবা করে চলেছেন নিরন্তর।

প্রার্থিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি। দল এবং দেশের জন্য আগামীতেও কাজ করে যেতে চাই। মাদক ও দুর্নীতিমুক্ত স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে জননেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কাজ করতে চাই। আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে স্বেচ্ছাসেবক লীগের মুহাম্মদ গোলাম কবির ভূঁইয়া এর আগে ব্রিটিশ ইমিগ্রেশন মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া ব্রিটিশ অর্থ মন্ত্রণালয়েও কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় জনহিতকর কাজে সম্পৃক্ত আছেন স্বচ্ছ ভাবমূর্তির এই নেতা। আগামী নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে মনোনয়ন দিলে জয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী। বিজয়ী হলে উন্নত ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে ভূমিকা রাখব।

মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে করিমগঞ্জ ও তাড়াইলের গ্রামগঞ্জ চষে নিজের একটি অবস্থান গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন অ্যাডভোকেট মোজাম্মেল হক মাখনও।ওসমান ফারুক দেশের বাইরে থাকায় একাদশ জাতীয় নির্বাচনে প্রথমে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন জেলা কমিটির সহসভাপতি অ্যাডভোকেট জালাল মোহাম্মদ গাউস। বিকল্প প্রার্থী করা হয়েছিল করিমগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ভিপি সাইফুল ইসলাম সুমনকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঐক্যফ্রন্টের সমীকরণের কারণে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন তারা। তবে আগামী নির্বাচনে তারা ফের দলীয় মনোনয়ন চাইবেন।

তবে বিএনপির নেতাকর্মীরা বলছেন, ওসমান ফারুক ভোটে অংশ না নিতে পারলে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে এগিয়ে থাকবেন জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা, বর্তমানে তিনি জেলা বিএনপির সহসভাপতি। ২০০৮ সালে এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন তিনি। আপাতত বর্তমান সরকারের অধীনে বিএনপি নির্বাচনে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকায় ভোট নিয়ে কোনো মন্তব্য করছেন না তিনি। তবে নির্বাচন সামনে রেখে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছেন জাহাঙ্গীর।

বড় তিন দলের বাইরে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) জেলা শাখার সাব্কে সভাপতি ডা. এনামুল হক ইদ্রিছ ও রঞ্জিত কুমার সরকারের নাম শোনা যাচ্ছে। এ ছাড়াও মাঠে আছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জেলা কমিটির সভাপতি মাওলানা আলমগীর হোসাইন তালুকদার ও গণতন্ত্রী পার্টির দিলোয়ার হোসাইন ভূঁইয়া। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে সংসদ সদস্য মুজিবুল হক চুন্নু প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, জাতীয় পার্টি চায় যে কোনো পন্থায় অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমি জাপার প্রার্থী। করিমগঞ্জ ও তাড়াইলের ভোটাররা আমার বিকল্প কাউকে ভাবে না। বারবার জয়ী হয়ে আমি তা প্রমাণ করেছি।