
রবিউল ইসলাম, বাঘা (রাজশাহী) প্রতিনিধি:
আমি গেরিলা যুদ্ধে সয়ংক্রিয় অংশগ্রহণ করেছি। ১৯৭১ সালের জুলাইয়ের শেষ দিকে ভারতে ট্রেনিং শেষ করে বাংলাদেশে আসি। তৎকালীন সময়ে আমি মুক্তিযোদ্ধা টিমে অংশগ্রহণ করে সফল ভাবে ৩/৪টা অপারেশন সম্পন্ন করি। যুদ্ধের সময় নাটোর, বনপাড়া এবং রাজশাহীর কিছু অংশ আমাকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল। আমার প্রথম অপারেশন ছিলো নাটোরের দামাগাড়ি এলাকায়। সেখানে আমরা ১২ জন মুক্তিযোদ্ধা ১৪ জন রাজাকারকে হত্যা করতে সক্ষম হই। ২য় অপারেশন নাটোর ব্রিজ, সেখানে ৮/৯ জন পাকিস্তান আর্মি গাড়িতে করে ব্রিজ পার হচ্ছিল। এ সময় আমাদের কমান্ডার হিসেবে ছিলেন, আবুল কালাম আজাদ। তিনি ছিলেন পাকিস্তান আর্মির নায়েক সুবেদার। তার নির্দেশে আমরা ৯ জন পাকিস্তানী পাকবাহিনী কে মারতে সক্ষম হই। এ অপারেশনে মোট ৩২ জন মুক্তিযোদ্ধা অংশগ্রহণ করে। প্রথমে আমরা ব্রিজ এর পশ্চিম পাশে পানিতে এবং আঁখ (কুশর) ক্ষেতে অবস্থান নেই। পাকিস্তানি বাহিনীর গাড়িটি যখন ব্রীজের উপর উঠে ঠিক তখনই সুযোগ বুঝে ৩২ জন মুক্তিযোদ্ধা একসাথে গাড়ির চাকায় গুলি করলে গাড়িটি উল্টে ৯জন পাক হানাদার বাহিনীর সদস্য মারা যায়। কিন্তুু তাদের মারার পরে পালিয়ে আসার সুযোগ ছিলোনা। দিনটি ছিল অত্যন্ত স্মরণীয়। এ অপারেশন সফল হওয়ার পরপরই পাকিস্থানি হানাদার বাহিনী হাজার হাজার গুলি আমাদের দিকে ছুড়তে থাকে। আমরা আঁখ ক্ষেতে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকি। পরের দিন রাতে আবার বের হয়ে আসি। দীর্ঘ সময় খাবার না খাওয়ায় আমরা দুর্বল হয়ে পড়ি। আমরা সেখান থেকে বের হয়ে লুকমানপুর ব্রিজের দিকে যায়। ব্রীজের খুব কাছের একটা দোকান থেকে বিস্কুট আর পানি খেয়ে রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর চরের খাজিরাত ক্যাম্পে চলে আসি। তারপর অর্ডার হলো কলম কুন্ডুর রাজাকারদের মারতে হবে। সেখানে ৪০/৪৫ জন রাজাকার বিহারী অবস্থান করছিল। তাদের অনেক কে আমরা মারতে সক্ষম হই। তবে এদের কেউ কেউ নদী সাঁতরে পালিয়ে যায়। এ যুদ্ধে আমার সহযোদ্ধা বন্ধু ইসহাক এবং শহিদুল রাজাকারের গুলিতে শহীদ হয়।
একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলছিলেন রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযুদ্ধা জনাব আলী। তিনি ১৯৫১ সালের ১৭ জানুয়ারী রাজশাহীর বাঘা উপজেলার হরিণা মাস্টার পাড়া নামের একটি ছোট্ট গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। তিনি এ গ্রামেই বেড়ে উঠেন। এখানেই কাটে তার শৈশব-কৈশোর, তিনি বাপ-দাদার পৈতৃক ভিটে আর পুরোনো স্মৃতি কে আকড়ে ধরে সেখানেই বাস করেন। রনাঙ্গনে ঝাপিয়ে পড়া সে দিনের সেই টকবগে যুবক এখন বার্ধক্যে পা রেখেছেন।
১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদদের পবিত্র রক্তের বিনিময়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। তাদের এই ত্যাগের বিনিময়ে আমরা বাঙ্গালীরা পেয়েছি বাংলা ভাষা আর পৃথিবীর বুকে একটুকরো স্বাধীন ভূখণ্ড। বর্তমান প্রজন্মের সৌভাগ্য হয়নি এই যুদ্ধ দেখার। দেশ স্বাধীনের এই গল্প এখন শুধুই কাল্পনিক রুপকথার গল্পের মতোই। তাই এ বিষয়ে রয়েছে নানা কৌতুহল। অন্ধকার যুক্ত অজানা কৌতুহল কে দূর করে প্রকৃত সত্যের দ্বার উন্মোচিত করার জন্য যোগাযোগ করা হয় ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে সরাসরি অংশ গ্রহণকারী প্রকৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব আলীর সাথে।
কথা হয় নিরিবিলি পরিবেশে তার বাড়ির পাশের এক পুকুর পাড়ে। এ সময় তিনি বাংলাদেশ আমার এর প্রতিনিধিকে একের পর এক জানাতে থাকেন ১৯৭১ সালের সেই লোমহর্ষক হৃদয় বিদারক যুদ্ধ জয়ের গল্প। তিনি বাঙ্গালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের কালজয়ী ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে মাত্র ১৪ বছর বয়সে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করেন। তিনি তৎকালীন সময়ে ভারতের পানিপিয়া বিহার বীরভূম রামপুর হাট নামক এলাকায় ট্রেনিং শেষ করে দেশে ফিরে আসেন। তারপর তিনি মুক্তিযুদ্ধের ৭নং সেক্টর এলাকায় যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন। তিনি নাটোরের বড়াইগ্রাম, কলম পুন্ডর, বনপাড়া, দয়রামপুর, লালপুর-বাগাতিপাড়া এবং রাজশাহীর কিছু অংশে মুক্তিযুদ্ধাদের সাথে যুদ্ধে অংশ গ্রহন করেন। তিনি বলেন, এ যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমার মুক্তিযুদ্ধা বন্ধু শহিদুল ও ইসহাক কে হারিয়েছি। তারা দু'জনে নাটোরের কলম পুন্ডর এলাকায় একটি অপারেশনে রাজাকারের গুলিতে নির্মমভাবে শহীদ হন। তবে এখনও তার ওই রণাঙ্গনের মুক্তিযুদ্ধা বন্ধু হুদা জীবিত আছে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব আলীর এফ এফ নম্বর (৪০৯৮), লাল মুক্তিবার্তা বই নং- ০৩০২০৩০০৫৪, গেজেট নং- ৫৯৩, মুক্তিযুদ্ধা পরিচিত নং-০১৮১০০০০০৪৪৬ । তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধের ছয় বছর পরে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বর্তমানে তিনি এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জনক। দুই সন্তানেরই বিয়ে দিয়েছেন, তাদের কোল জুড়ে এসেছে দুই জনের চার কন্যা সন্তান। তিনি নিজের স্ত্রী, ছেলে-ছেলের বউ এবং নাতিনদের নিয়ে বেশ আনন্দে জীবন যাপন করছেন।
বর্তমান সরকারের কাছে কোন কিছু চাওয়া পাওয়ার আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বঙ্গবন্ধু কণ্যা শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে বলেন,বর্তমান সরকার আমাদের (মুক্তিযোদ্ধাদের) অনেক কিছু দিয়েছে। প্রতি মাসে বিশ হাজার টাকা করে মুক্তিযুদ্ধ ভাতা দিচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধাদের বাড়ি করে দিয়েছে, অসুস্থ মুক্তিযুদ্ধাদের বিনা মূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। কমান্ডার হিসেবে উপজেলা পযার্য়ের মুক্তিযুদ্ধাদের ব্যাপারে কিছু বলার আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক মুক্তিযোদ্ধা শারিরীক ভাবে দুর্বল, অসুস্থ, বিছানাগত এবং পঙ্গু হয়ে আছে। এদের মধ্যে যে সকল মুক্তিযোদ্ধারা ব্যাংক লোন করেছে তাদের ব্যাংক লোন মওকুফ করে দিলে খুশিতে মৃত্যু বরণ করতে পারবে।
রণাঙ্গনের এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বর্তমানে রাজশাহীর বাঘা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা ফেডারেশন এর ভারপ্রাপ্ত কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করছেন।
সম্পাদক- আবদুর রহমান
০১৩০৩১১২৬৭৬
Web:https://bangladeshamar.com/ Email: doinikbangladeshamar@gmail.com
Address: F-8, KA-90,JHK WINDCEL, KURIL KAZI BARI,VATARA,DHAKA-1229.
Copyright © 2026 বাংলাদেশ আমার. All rights reserved.