আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরাকে বুধবার থেকে শুরু হয়েছে আদমশুমারি৷ সারা দেশে কারফিউ জারি করা হয়েছে৷ বুধ ও বৃহস্পতি – এই দুই দিনে দেশটির বাসিন্দাদের ৭০টির বেশি প্রশ্ন করা হবে৷ ইরাকের জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে চার কোটি বলে ধারণা করা হয়৷
এক বাড়িতে কয়জন বাস করেন, বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যের অবস্থা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, কর্মসংস্থান, গাড়ির সংখ্যা, এমনকি জীবনযাত্রার মান জানতে একটি বাড়িতে কী ধরনের অ্যাপ্লায়েন্স আছে, তা জানার চেষ্টা করা হবে৷
প্রায় এক লাখ ৪০ হাজার কর্মীকে আদমশুমারির জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে৷ তারা তথ্যগুলো ট্যাবলেটে লিপিবদ্ধ করবেন৷ তাই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া যাবে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে৷ আর দুই মাস পর পুরো ফল প্রকাশ করা হবে৷
ইরাকের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানি বলেন, ‘‘ইরাকের উন্নয়ন এবং অগ্রগতিতে অবদান রাখে এমন সব ক্ষেত্রে পরিকল্পনার জন্য আদমশুমারি গুরুত্বপূর্ণ৷”
৪০ বছর পর পুরো ইরাকজুড়ে আদমশুমারি হচ্ছে৷ ২৭ বছর আগে ১৯৯৭ সালেও একবার আদমশুমারি হয়েছিল৷ কিন্তু সেবার স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তানকে বাদ রাখা হয়েছিল৷
এরপর ২০০৭ সালে কয়েকবার আদমশুমারির পরিকল্পনা করা হয়েছিল৷ কিন্তু এর ফলে দেশ অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে সেই আশংকায় পরিকল্পনা স্থগিত করা হয়৷ এরপর ২০০৯ সালে আদমশুমারির সময় মসুলে আদমশুমারির কয়েকজন কর্মীকে হত্যা করা হয়েছিল৷
৪০ বছর পর আদমশুমারি হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ আছে৷
২০০৩ সালে সাদ্দাম হুসেনের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে একটি ব্যবস্থা চালু করে৷ সে কারণে দেশটির প্রধানমন্ত্রী সবসময় একজন শিয়া মুসলিম হয়ে থাকেন, কারণ ইরাকে শিয়ারা সংখ্যাগরিষ্ঠ৷ আর সংসদের স্পিকার হন একজন সুন্নি মুসলিম, প্রেসিডেন্ট হন একজন কুর্দি৷ সব গোষ্ঠীর মানুষের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য এমন ব্যবস্থা করে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছে৷
আদমশুমারির কারণে সেই ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন৷ সংবিধান অনুযায়ী ইরাকে প্রতি এক লাখ নাগরিকের বিপরীতে একজন সাংসদ থাকার কথা৷ সেই হিসেবে দেশটির সংসদের বর্তমান আসন সংখ্যা ৩২৯ থেকে বেড়ে ৪৫০ হতে পারে বলে মনে করছেন প্যারিসের ফ্রেঞ্চ রিসার্চ সেন্টার অন ইরাকের পরিচালক আদেল বাকাওয়ান৷ তিনি বলেন, কুর্দিদের মধ্যে জন্মহার এক দশমিক ৯, আর শিয়াদের ৪.৯৯৷ ফলে ইরাকে শিয়াদের প্রভাব আরও বাড়বে৷
খরায় বিপর্যস্ত ইরাক৷ বিশেষ করে দেশের মূল দুই নদী টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিসের তীরবর্তী নাজাফ অঞ্চলের বাসিন্দারা সবচেয়ে বেশি যুঝছেন খরার সাথে৷ পানির অভাবে ধুঁকছে তাদের পোষা গরু, মহিষ৷ বাধ্য হয়ে অনেকে বিক্রিও করে দিচ্ছেন তাদের প্রাণপ্রিয় পোষ্যদের৷
ইরাকের পানি সম্পদ মন্ত্রী খালেদ শেমাল জানান যে গত বছর অন্যান্য বছরের তুলনায় মাত্র ৪০ শতাংশ পানি পেয়েছে নাজাফ অঞ্চলের মানুষ৷ পরিস্থিতি ইরাকের দক্ষিণে আরো খারাপ যেখানে বিগত চার দশকের সবচেয়ে খারাপ দাবদাহের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে৷ জাতিসংঘ বলছে, ইরাকের জলাভূমির মাত্র ৭০ শতাংশে রয়েছে পর্যাপ্ত পানি৷
শেমালের মতে, তুরস্ক ও ইরানে বাঁধ দেবার ফলে ইরাকে পানির সংকট দেখা দিয়েছে৷ পাশাপাশি, পুরোনো হয়ে যাওয়া সেচ পদ্ধতি, জলবায়ু পরিবর্তন ও অব্যবস্থাপনাই এই অবস্থার জন্য দায়ী বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা৷
স্থানীয় চাষীদের জন্য পরিস্থিতি ভয়াবহ৷ পানির অভাব তো বটেই, সাথে অবশিষ্ট পানির মানও সেখানে খারাপ হয়েছে সময়ের সাথে৷ এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেখানকার জীবজন্তুর জীবনও৷ পানিতে বাড়ন্ত লবণের ফলে তা ক্রমেই মানুষ ও প্রাণী, দুইয়ের জন্যেই অপেয় হয়ে পড়েছে৷
২০২৯০ সাল পর্যন্ত নাজাফ অঞ্চলে যত কৃষি জমি ছিল, তার মাত্র পাঁচ শতাংশ বর্তমানে চাষযোগ্য৷ শুধু তাই নয়, গোটা ইরাকের অর্ধেক কৃষিজমিরই এক অবস্থা৷ পরিস্থিতি এমনও হয়েছে যে ধান চাষ বন্ধ করে দিতে হয় বহু কৃষকদের৷
গরু বা মহিষ ঠিকঠাক খাবার বা পানি না পেলে তাদের মাঠে কাজ করার বা দুধ দেবার ক্ষমতা কমে যায়৷ আবদুল হোসেনের মতো কৃষক, যাদের আয় আসে চাষ করে ও দুধ বেচে, এই সমস্যার মাঝে আটকে পড়েন৷
পরিস্কার পানির খোঁজে নাজাফ অঞ্চলের মানুষ ভিটে ছেড়ে চলে যাচ্ছেন৷ যেখানে অন্য কোনো উপার্জনের দিক খোলা, বা যেখানে অন্তত পরিস্কার পানির ব্যবস্থা আছে, সেদিকেই রওয়ানা দিচ্ছেন সবাই৷ আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএমের মতে, খরার ফলে ৬২ হাজার মানুষ ঘরছাড়া ইরাকে৷
আদমশুমারি নিয়ে আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে কুর্দিস্তান৷ এটি এখন স্বায়ত্তশাসিত একটি এলাকা৷ তবে ইরাকি সরকার মনে করে এটি ফেডারেল ইরাকের অংশ৷ কিন্তু বাস্তবে এলাকাটি কাদের, সেই প্রশ্নের সমাধান আছে ইরাকের ২০০৫ সালের সংবিধানে৷ সেখানে আদমশুমারির কথা বলা আছে৷ এর মাধ্যমে জানা সম্ভব হবে ঐ এলাকায় প্রকৃতপক্ষে কারা বেশি বাস করেন৷ আদমশুমারির ফলাফলে হয়ত এমন তথ্য বেরিয়ে আসবে, যেটি কুর্দি বা আরবদের নাও পছন্দ হতে পারে৷
আদমশুমারির কারণে ইরাকের তথাকথিত ‘ভূত কর্মচারী’ সমস্যার সমাধান হতে পারে৷ এই কর্মচারীরা দুটি চাকরিতে আছেন৷ একটি সরকারি চাকরি, আরেকটি বেসরকারি৷ অনেকে আছেন সরকারি চাকরিতে উপস্থিত না থেকে বেতন তোলেন৷ উপস্থিত না থাকার জন্য তারা বেতনের একটি অংশ বসকে ঘুস দিয়ে থাকেন৷ এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, সরকারি চাকরিতে প্রায় ১০ শতাংশ ‘ভূত কর্মচারী’ আছেন৷
আদমশুমারির ফল নিয়ে উদ্বেগ দূর করার জন্য সরকার কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে৷ এরমধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, একজন ব্যক্তির ধর্ম সম্পর্কে জানা হবে৷ তবে তিনি শিয়া, নাকি সুন্নি, নাকি কুর্দি সেই প্রশ্ন করা হবে না৷
এই উদ্যোগের কারণে এবারের আদমশুমারিকে ঘিরে বিপজ্জনক কিছু হবে না বলে আশা করছেন থিংক ট্যাংক ক্রাইসিস গ্রুপের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিভাগের প্রোগ্রাম পরিচালক ইয়ুস্ট হিল্টারমান৷

