মোস্তাফিজার রহমান
বিশ্ব সমাজ ব্যবস্থায় বিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তবে বাল্যবিবাহ দেশ ও জাতির জন্য অভিশাপ। পৃথিবীর যে কয়টি দেশে বাল্যবিবাহের প্রবণতা বেশি, বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। আমাদের দেশে বেশিরভাগ মেয়ের বিয়ে হয় ১২-১৮ বছরের মধ্যে। এসব বাল্যবিবাহের অধিকাংশ কারণ হচ্ছে- দরিদ্রতা, সচেতনতার অভাব, প্রচলিত প্রথা ও কুসংস্কার, সামাজিক অস্থিরতা, মেয়েশিশুর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি, নিরাপত্তার অভাব, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, যৌতুক এবং বাল্যবিবাহ রোধ-সংক্রান্ত আইনের যথাযথ প্রয়োগ না হওয়া।
সরকার এবং বেসরকারি সংস্থাগুলো বিভিন্ন রকম কর্মসূচিও পরিচালনা করছে। তবুও বাল্যবিবাহ অব্যাহত আছে। এর মধ্যে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলায় ৭৫ ভাগ কন্যাশিশু বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে। বালকদের মধ্যে এই হার কিছুটা কম। এই বাল্যবিবাহের মূলে আছে সুপাত্র প্রাপ্তি, দরিদ্রতা এবং যৌন হয়রানির ভয়। নানা ধরনের প্রতিরোধ-প্রতিবাদ সত্ত্বেও বাল্যবিবাহ রোধ করা যাচ্ছে না।
মহিদেব যুব সমাজ কল্যাণ সমিতি (এমজেএসকেএস) এর সহযোগিতা ও তথ্য অনুযায়ী নিজের বাল্যবিবাহ নিজেই বন্ধ করা ফুলবাড়ী উপজেলার ধর্মপুর গ্রামের শাহাদত হোসেন ও আম্বিয়া বেগম দম্পতির বড় মেয়ে শাকিলা আক্তার শারমিন। যখন সে ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী তখন তার বয়স ১৩ বছর। অভাবি সংসারে তার লেখাপড়া করার খরচ যোগাতে না পেয়ে বাল্যবিবাহ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় শারমিনের বাবা- মা। তখন সে তার বাবা- মাকে বাল্যবিবাহের কুফল সমন্ধে অবহত করে আর জানায় আম আমি বাল্যবিয়ে করবোনা আমি লেখাপড়া করতে চাই। তখন তার বাবা- মা তার কথায় সম্মতি দেয়। ঠিক সেই মূহুর্তে মহিদেব সমিতির মাধ্যমে লায়লা আর্ট এন্ড ক্যাফ্টে ১ মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে নিজ বাড়িতে বিভিন্ন প্রকার হাতের কাজের পাশাপাশি ইউনিলিভার কোম্পানির কিছু প্রোডাক্ট নিয়ে সে নিজেই একজন নারীর উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যবসা শুরু করে। শারমিন এখন আইএ পরীক্ষার্থী। এখন তার ইনকামের টাকা দিয়ে নিজের লেখাপড়া খরচ সহ সংসারের দেখভাল করছে। সে স্বপ্ন দেখছে একজন আদর্শ শিক্ষক হওয়ার ।
শাকিলা আক্তার শারমিনের মা আম্বিয়া বেগম জানায়,আমাদের অভাবী সংসারে যখন আমার মেয়ে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে তখন আমরা বিয়ে দেওয়ার জন্য সবকিছু ঠিক করি। কিন্তু আমার মেয়ে শারমিন বিয়েতে রাজি না হয়ে উল্টো আমাদের স্বামী-স্ত্রীকে বাল্যবিবাহর কুফল সম্পর্কে জানালে আমরা বিয়ে বন্ধ করে দেই। শারমিন এখন বিভিন্ন প্রকার হাতের কাজ ওনইউনিলিভারের কিছু জিনিস বিক্রি করে তার লেখাপড়া খরচ চালাচ্ছে এবং আমাদেরকেও সহযোগিতা করছে। মহিদেব যুব সমাজ কল্যাণ সমিতির ফিল্ড ফেসিলিটেটর নূরজাহান বেগম জানান, আমি কাশিপুর ইউনিয়নে সিএনবি প্রজেক্টে তিনটি বিষয় নিয়ে কাজ করি,সোই, এসআরএইচআর ও ইয়ুথলীড। আমি শাকিলা আক্তার শারমিনকে সুইপারপাস থেকে লায়লা আর্ট এন্ড ক্যাফ্টে এক মাসের ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করে দেই সে এই ট্রেনিং নিয়ে এসে বাড়িতে কাজ করে কাজের যে আয় হয় সেই টাকা দিয়ে তার নিজের লেখাপড়ার খরচ চালায় এবং তার পরিবারকে সহযোগিতা করে।
চাইল্ড, নট ব্রাইট (সিএনবি) প্রকল্পের টেকনিক্যাল অফিসার ইলিয়াস আলী জানান, চাইল্ড নট ব্রাইট (সিএনবি) প্রকল্পটি প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এর সহযোগিতায় মহিদেব যুব সমাজ কল্যাণ সমিতি (এমজেএসকেএস) ফুলবাড়ী, নাগেশ্বরী ও ভুরুঙ্গামারী এই তিন উপজেলা ৩০টি ইউনিয়নে কাজ করছে। এই প্রকল্পটির আওতায় মূলত: যারা বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে আছে তাদেরকে নিয়ে আমরা কাজ করছি পাশাপাশি তাদেরকে স্বপ্ন দেখাচ্ছি তাদের মধ্যে কনফিডেন্স বিলডাফ করছি এবং তাদেরকে ইকোনোমিকাল সহযোগিতা করছি, যাতে করে তারা নিজেরাই নিজেদের বাল্যবিবাহকে প্রতিরোধ করতে পারে এবং দেশ সমাজ থেকে বাল্যবিবাহের অভিশাপ থেকে মুক্ত করে একটা সুন্দর দেশ উপহার দিতে পারে।
উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সোহেলী পারভীন জানান,পারিবারিক অসচেতনতা, অস্বচ্ছতা, সামাজিক দারিদ্রতা ও মোবাইলের ইন্টারনেটের অপব্যবহার এগুলোর কারণে বাল্যবিবাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যারা বিয়ে পড়াচ্ছে যেমন ইমাম, কাজী, পুরোহিত যাদের রেজিষ্টার বই সঠিকভাবে ব্যবহার করা, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এ বিষয়ে সচেতন থাকা, বাল্যবিবাহ রোধে সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে সোচ্চার হতে হবে। জনসচেতনতা তৈরি করতে পারলে সমাজ থেকে বাল্যবিবাহ নিরোধ করা সম্ভব। নারী ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের মতে নিম্নোক্ত ব্যবস্থা গুলো গ্রহণ করলে গ্রহণ করলে বাল্যবিবাহ নিরোধ করা সম্ভব। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আইনের কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োগ করা, বিয়ের রেজিস্ট্রেশন নিশ্চিত করা, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে আইন তৈরি করা, মেয়েদের শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধির দিকে নজর দিতে হবে, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নিরোধ কমিটিকে আরও উদ্যোগী হতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ইমাম, প্রহিত,ধর্মীয় নেতা, এনজিও প্রতিনিধি ও কমিউনিটি নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে নিয়ে সম্মিলিতভাবে বাল্যবিয়ে রোধ করতে হবে। বাল্যবিবাহ রোধে সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে সোচ্চার হতে হবে। জনসচেতনতা তৈরি করতে পারলে সমাজ থেকে বাল্যবিবাহ নিরোধ করা সম্ভব।

