
২৭ বছর পর দিল্লির বিধানসভা বিজেপির দখলে৷ ধরাশায়ী আম আদমি পার্টি তাদের শীর্ষ নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল পরাজিত৷ এবারও খাতা খুলতে পারল না কংগ্রেস৷ দিল্লি বিধানসভার ৭০টি আসনে ভোটগ্রহণ করা হয়৷ দুই দফায় ক্ষমতায় থাকা আপ ও বিজেপির মধ্যে সরাসরি লড়াই ছিল৷ তৃতীয় শক্তি হিসেবে ছিল কংগ্রেস৷ এই ত্রিমুখী লড়াইয়ে বিপুল জয় পেয়েছে বিজেপি৷
ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মুখে বারবার শোনা গিয়েছে 'ডাবল ইঞ্জিন সরকার' শব্দবন্ধ৷ অর্থাৎ কেন্দ্রে ও রাজ্যে বিজেপি সরকার৷ বহু বছর পর তার সেই স্বপ্ন পূরণ হল রাজধানীতে৷ দিল্লি বিধানসভায় নিরঙ্কুশ পরিষ্ঠতা পেল পদ্ম শিবির৷
বুথ ফেরত সমীক্ষায় এমনই ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল৷ শনিবার সকালে ইভিএম খোলার পর থেকেই ট্রেন্ড স্পষ্ট হয়ে যায়৷ ঘড়ির কাঁটা যত এগোয়, বিজেপি ও আপের ব্যবধান বাড়তে থাকে৷ এর আগের দুটি বিধানসভা নির্বাচনে ৬০টির বেশি আসন জিতেছিল কেজরিওয়ালের দল৷ কিন্তু এ দিনের গণনায় কখনোই ৩০-এর ঘরে ঢুকতে পারেনি আম আদমি পার্টি৷
গত বিধানসভা নির্বাচনে মাত্র আটটি আসনে জয় পেয়েছিল বিজেপি৷ তার আগেরবার ফল ছিল আরো শোচনীয়, মাত্র তিনটি আসন জিতেছিল তারা৷ সেখান থেকে এ বার পঞ্চাশের আশপাশে পৌঁছে গিয়েছে গেরুয়া ব্রিগেড৷
১০ বছর ক্ষমতায় থাকা আম আদমি পার্টির মুখ অরবিন্দ কেজরিওয়াল৷ দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জেলে যাওয়ার পর বলেছিলেন, জনতার আদালতে জয়ী হলে তিনি ফের মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে বসবেন৷ কিন্তু নয়াদিল্লি আসনে হেরে গিয়েছেন আপের পোস্টার বয়৷ এই দলে সেকেন্ড ইন কমান্ড দিল্লির সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মণীশ সিসোদিয়া জঙ্গপুরা আসনে হেরেছেন ৬০০ ভোটে৷ জেলে যাওয়া আর এক নেতা ও সাবেক মন্ত্রী সত্যেন্দ্র জৈন পরাজিত হয়েছেন শকুর বস্তি আসনে৷
কেন্দ্রে বিজেপি সরকার গড়লেও খোদ দিল্লির বুকে গত ১১ বছর বিরোধীদের রাজত্ব থেকে গিয়েছিল৷ আপের আগে বিধানসভা ছিল কংগ্রেসের হাতে৷ বিজেপির মদনলাল খুরানা, সাহেব সিং বর্মা মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন গত শতকে৷ প্রায় তিন দশক পর দিল্লিতে ফুটল পদ্ম৷ বিজেপি ৪৮ আসন পেতে চলেছে, আম আদমি পার্টি ২২৷ যদিও প্রাপ্ত ভোটে বেশি ফারাক নেই৷ বিজেপি ৪৬ ও আপ ৪৪ শতাংশের কাছাকাছি ভোট পেয়েছে৷ কংগ্রেসের প্রাপ্তি ৭ শতাংশের মতো ভোট৷
কে নতুন মুখ্যমন্ত্রী হবেন, সেটা নিয়ে পরে সিদ্ধান্ত হবে বলে বিজেপি সূত্রের খবর৷ শনিবার রাত পৌনে আটটা নাগাদ বিজেপি কার্যালয়ে আসবেন নরেন্দ্র মোদী৷ রাজস্থান বা মধ্যপ্রদেশের মতো চমক জাগিয়ে কোনো নতুন মুখকে মুখ্যমন্ত্রী করা হয় কি না, সেদিকে নজর রয়েছে৷ সাবেক বিজেপি সাংসদ রমেশ বিধুরি হেরে গিয়েছেন৷ আর এক সাবেক সাংসদ প্রবেশ বর্মা কেজরিওয়ালকে হারিয়ে এখন জায়ান্ট কিলার৷ তিনি এগিয়ে রয়েছেন কুর্সির দৌড়ে৷
দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্না হাজারের যে আন্দোলন, তার অন্যতম সৈনিক হিসেবে উঠে এসেছিলেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল৷ গত দুই বছরে তিনি সবচেয়ে বেশি বিদ্ধ হয়েছেন এই দুর্নীতির প্রশ্নেই৷ আবগারি কেলেঙ্কারি মামলায় জেলে যেতে হয়েছে তাকে৷ তার ঘনিষ্ঠ একাধিক নেতার একই হাল হয়েছে৷
মুখ্যমন্ত্রীর আবাস নিয়ে কম বিতর্ক হয়নি৷ প্রশ্ন উঠেছে, দুর্নীতির টাকাতেই কি বিলাসবহুল বাসভবন গড়ে তুলেছেন আম আদমির নেতা? বিজেপি দুর্নীতিকে সামনে রেখে জোরালো প্রচার চালিয়েছিল৷ ফল প্রকাশের পর আন্না হাজারে বলেছেন, ‘‘ভোটের প্রার্থীকে কলঙ্কমুক্ত শুদ্ধ হতে হয়, তবেই তার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা জন্মায়৷ এ কথা বারবার বলেও বোঝানো যায়নি৷''
জনমোহিনী রাজনীতিতে মানুষের মন কেড়েছিলেন অরবিন্দ৷ এবারের নির্বাচনী লড়াইয়ে তার থেকেও বেশি সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি৷ বিনামূল্যে ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ শুধু নয়, যুবকদের চাকরি থেকে নারীদের অ্যাকাউন্টে টাকা, সন্তানসম্ভবাকে অনুদানের মতো নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা৷ খেটে-খাওয়া দরিদ্র মানুষ, যারা মূলত আপের ভোটার, তাদের জন্য প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি৷ প্রতিষ্ঠান বিরোধী মানসিকতার সঙ্গে জনকল্যাণের রসায়ন সাফল্যের সঙ্গে বাস্তবায়িত করতে পেরেছে মোদী ব্রিগেড৷
এবারের ভোটে দিল্লির দূষণও যথেষ্ট আলোচনায় ছিল৷ এক্ষেত্রে আপ ব্যর্থ বলে প্রচার করেছে বিজেপি ও কংগ্রেস৷ দিল্লির ব্যাপক দূষণ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, যমুনার বেহাল দশা ভোটারদের একাংশকে প্রভাবিত করেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা৷
ভোটের ঠিক আগে জাতীয় বাজেট বিজেপিকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে৷ দিল্লিতে ৬৭ শতাংশ মধ্যবিত্তের বাস৷ কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী ও সেনাকর্মী মিলিয়ে জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ৷ এবারের বাজেট এই অংশকে অনেকটাই খুশি করেছে৷ বিশেষত ১২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বার্ষিক আয় করমুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত মাস্টারস্ট্রোক বলে মনে করা হচ্ছে৷
হারের পর কেজরিওয়াল বলেন, ‘‘আমরা এখানে গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করব৷ সমাজসেবা এবং মানুষের হিতার্থে কাজ চালিয়ে যাব৷ ক্ষমতা ভোগ করার জন্য আমরা রাজনীতিতে আসিনি৷''
কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বলেন, ‘‘মানুষের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি তারা পরিবর্তন চাইছিলেন৷ যারা জিতেছেন তাদের অভিনন্দন৷ আমরা যারা পরাজিত হয়েছি তাদের আরো পরিশ্রম করতে হবে৷'' খবর: ডিডব্লিউ
সম্পাদক- আবদুর রহমান
Web:https://bangladeshamar.com/ Email: doinikbangladeshamar@gmail.com
Address: F-8, KA-90,JHK WINDCEL, KURIL KAZI BARI,VATARA,DHAKA-1229.
Copyright © 2026 বাংলাদেশ আমার. All rights reserved.