মোঃ আশিকুর রহমান
আজমিরীগঞ্জ (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি

ভাটি বাংলার মুকুটবিহীন সম্রাট, জেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সহ-সভাপতি ও আজমিরীগঞ্জ উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান “মরহুম হাফিজ উদ্দিন আফাই” এর ২৪ তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। মরহুম হাফিজ উদ্দিন আফাই ২১ আগস্ট ১৯৩৯ইং সালে হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জের শরীফ নগর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বৃহত্তর সিলেট বিভাগসহ ময়মনসিংহ-নেত্রকোনা-কিশোরগঞ্জ জেলায় “আফাই মিয়া” নামে পরিচিত ছিলেন।

তাঁর পিতার নাম মরহুম মিয়াধন মিয়া এবং মাতা মরহুম মোছাম্মদ রাইতুন নেছা। তাঁর পিতা ছিলেন অত্র এলাকার একজন সু-পরিচিত ও পঞ্চায়েত ন্যায় বিচারক এবং তাঁর মাতা ছিলেন আদর্শ সু-গৃহিনী। তাঁরা ছিলেন ৪ ভাই ও ২ বোন। এর মধ্যে তিনি ছিলেন ৫ম।

তাঁর বড় ভাই মরহুম মালুম মিয়া ছিলেন চেয়ারম্যান এবং দ্বিতীয় ভাই মরহুম রফিক উদ্দিন আহমেদ পাকিস্তান আমলে আজমিরীগঞ্জ-বানিয়াচং-নবীগঞ্জ সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য (এমএলএ) ছিলেন।

মরহুম হাফিজ উদ্দিন আফাই ছোটবেলা থেকে দুরন্তপনা ছিলেন। তিনি আজমিরীগঞ্জে শরিফনগর প্রাইমারী স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে এএবিসি পাইলট মডেল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। লেখাপড়ায় বেশি অগ্রসর না হতে পারলেও সামাজিক শিক্ষা তাঁকে উন্নতির শিখরে নিয়ে গেছে। তাঁর ২ স্ত্রী, ২ ছেলে ও ২ মেয়ে। তিনি ছোটবেলা থেকেই বাম রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। রাজনীতি শুরু করেন ন্যাপ থেকে।

দেশের রাজনৈতির কারণে সময়ের প্রেক্ষাপটে প্রথমে জাতীয় পার্টি পরবর্তিতে জেলা আওয়ামীলীগের সদস্য ছিলেন। ১৯৯৬ সালে তাঁকে কেন্দ্র থেকে আমন্ত্রণ জানিয়ে হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়। এলাকার জনগনের সঠিক ন্যায় জন্যই তার রাজনীতি করা মূল বিষয়। মরহুম হাফিজ উদ্দিন আফাইর প্রচেষ্টায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ আজমিরীগঞ্জ সফর করেছেন। কথিত আছে, কোন একসময় তিনি এক কাপ চায়ের দাম দিয়েছিলেন ৮০ হাজার টাকা।

বর্নাঢ্য জীবনের অধিকারী হাফিজ উদ্দিন আফাই আজমিরীগঞ্জ ফিস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান ছিলেন। ওই ইন্ডাস্ট্রি থেকে এশিয়ার বিভিন্ন দেশসহ ইউরোপ দেশগুলোতে মাছ রপ্তানি করা হতো, মানসম্মত ও চাহিদামূলক মাছ রপ্তানি করার জন্য ১৯৮৪ ও ১৯৮৫ ইং সালে পরপর দুইবার আমেরিকা ফুড ফর এসোসিয়েশনের কাছ থেকে পুরস্কার লাভ ও এশিয়ার মধ্যে ২নং ফিস ইন্ডাষ্ট্রিজ স্থান সুনাম অর্জন করায় সেই সময়ের রাষ্ট্রপতি হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ ইন্ডাস্ট্রিটি পরিদর্শন করেছিলেন। ১৯৭৭, ১৯৮০ ও ১৯৮৩ সালে একটানা তিনবার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি, ওই সময়ের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাঁকে সরকারের পক্ষ থেকে পুরষ্কৃত করেন। ১৯৮৫ ও ১৯৮৯ ইং সালে দুইবার বিপুল ভোটে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন।

স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহন করে তিনি যেমন আলোচিত ছিলেন তেমনি পার্শ্ববর্তী জেলা, উপজেলা, পৌরসভায় নিজস্ব এমপি ও চেয়ারম্যান প্রার্থী দিয়েও আলোচিত ছিলেন। হাফিজ উদ্দিন আফাই ১৯৮৫-১৯৯৬ ইং সাল পর্যন্ত খালিয়াজুরী গ্রুপ জলমহালের ইজারাদার ছিলেন। এছাড়াও তিনি ভেড়ামোহনা, কোদালিয়া, কুশিয়ারা, ছাইন্দা, বান্ডা জলমহাল, জল কাঠখাল, ধলেশ্বরী প্রভৃতি জলমহাল ও আজমিরীগঞ্জ হাট বাজারের একটানা প্রায় ১৬ বছর ইজারাদার ছিলেন।

তিনি আমৃত্যু আজমিরীগঞ্জ বাজার বণিক সমিতির সভাপতি ছিলেন। ভাটি বাংলার খুন-খারাবি, মারামারিসহ বিভিন্ন ধরণের সামাজিক সমস্যা নিরসনে তিনি সবসময়ই পালন করেছেন অগ্রনী ভূমিকা। মাঝে মধ্যে খেলাধুলা, বাউল সঙ্গীত, যাত্রা পালা, নৌকা বাইচেরও আয়োজন করতেন আফাই। ১৯৭৫ ইং সালে পিতার নামকরণে আজমিরীগঞ্জ পৌরসভায় মিয়াধন মিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় সম্পূর্ণ নিজ অর্থায়নে প্রতিষ্ঠা করেন।

তিনি সম্পূর্ণ নিজ অর্থায়নে তৈরি করেছেন হবিগঞ্জ জেলা ডিসি অফিসের সামনে দুর্জয় স্মৃতিসৌধ। নেত্রকোনা জেলায় খালিয়াজুরী, রানছাপুর, কিশোরগঞ্জ জেলায় ইটনা উপজেলার ধনপুরে মসজিদ এবং আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় কওমি মাদ্রাসা সম্পূর্ণ নিজ অর্থায়নে প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮৬ সালে আজমিরীগঞ্জ উপজেলার থানা পুকুরটি সরকারকে দান করেন।

তিনি আজমিরীগঞ্জ সরকারি ডিগ্রী কলেজে আর্থায়ন ও বিভিন্নস্থানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দির, ঈদ-পূজায় অনুদান এবং গরিব অসহায় মেয়েদের বিয়েতে সম্পূর্ণ নিজ খরচে প্রচুর অর্থ দান করেছেন। ভাটি বাংলার জনগণসহ বিভিন্ন জায়গা ভাটিরাজ-দানবীর আফাই নামের কথা তাদের মুখে আজও শোনা যায়। উল্লেখ্য, তিনি ৬২ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ২০০১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর আজমিরীগঞ্জে মৃুত্যবরণ করেন।