
আহসানুল হক নয়ন
ব্রাহ্মণবাড়িয়া–৪ (কসবা–আখাউড়া) আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী মুশফিকুর রহমানের নাগরিকত্ব ও মনোনয়নের বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। তাঁর সাম্প্রতিক ভ্রমণ ইতিহাস, কানাডিয়ান পাসপোর্ট ব্যবহার, নাগরিকত্ব ত্যাগ সংক্রান্ত দাবির অসঙ্গতি এবং হলফনামায় দেওয়া তথ্যের সঙ্গে সরকারি নথির গরমিল—সব মিলিয়ে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
কানাডিয়ান পাসপোর্টে বাংলাদেশে প্রবেশ সরকারি ইমিগ্রেশন নথি অনুযায়ী, মুশফিকুর রহমান সর্বশেষ ২৫ আগস্ট ২০২৫ তারিখে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। সে সময় তিনি কানাডিয়ান পাসপোর্ট ব্যবহার করেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
নথিতে তাঁর পরিচয়—নাম: Mushfi Qur Rahman, জন্ম তারিখ: ০৮ জানুয়ারি ১৯৪০,
পাসপোর্ট নম্বর: AS037031, ভ্রমণ ইতিহাসে দেখা যায়—০১ জুলাই ২০২৫: দুবাই থেকে বাংলাদেশে আগমন ২৮ জুলাই ২০২৫: বাংলাদেশ ত্যাগ ২৬ আগস্ট ২০২৫: প্যারিস থেকে পুনরায় বাংলাদেশে আগমন
এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, মনোনয়ন দাখিলের আগ পর্যন্ত তিনি কার্যত কানাডিয়ান নাগরিক হিসেবেই আন্তর্জাতিক ভ্রমণ করেছেন।
হলফনামায় নাগরিকত্ব ত্যাগের দাবি, নেই প্রমাণ
মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দাখিল করা হলফনামায় মুশফিকুর রহমান উল্লেখ করেছেন—“আমি কানাডার নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছি।”
তবে নাগরিকত্ব ত্যাগের পক্ষে কোনো বৈধ দলিল বা সমর্থনকারী নথি জেলা প্রশাসক (ডিসি) কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। এ কারণে তথ্য গোপনের অভিযোগ সামনে এসেছে। নাগরিকত্ব ত্যাগের সময় নিয়ে বড় অসঙ্গতি কানাডা সরকারের নিয়ম অনুযায়ী—নাগরিকত্ব পরিত্যাগ (Renunciation of Citizenship) প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে ১১ থেকে ১৬ মাস সময় লাগে।
সরকারিভাবে Certificate of Renunciation ইস্যু না হওয়া পর্যন্ত কেউ নাগরিকত্ব হারান না।
নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে এই সনদের সত্যায়িত কপি দাখিল করা বাধ্যতামূলক।
কিন্তু প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, মুশফিকুর রহমান ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখকে নাগরিকত্ব ত্যাগের তারিখ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা প্রক্রিয়াগতভাবে অসম্ভব বলে মত আইন বিশেষজ্ঞদের।
পাশাপাশি এই বিষয়ে কোনো সরকারি সনদও তিনি জমা দেননি। পূর্বের নজিরে মনোনয়ন বাতিল এর আগে চট্টগ্রাম–৯ আসনে একই ধরনের অভিযোগে এক প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের নজির রয়েছে। সে ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রমাণ না দেওয়া, তথ্য গোপন এবং নাগরিকত্বের অবস্থান অস্পষ্ট রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। আইনজ্ঞদের মতে, একই যুক্তিতে মুশফিকুর রহমানের মনোনয়নও বাতিলযোগ্য হতে পারে।

আইন কী বলছে সংবিধানের ৬৬(২)(গ) ধারা: বিদেশি নাগরিকত্বধারী ব্যক্তি সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। Representation of the People Order (RPO) ১২(১)(গ): মনোনয়নে তথ্য গোপন করলে মনোনয়ন বাতিলযোগ্য। দণ্ডবিধি ৪২০, ৪৬৮ ও ৪৭১ ধারা: প্রতারণা, জালিয়াতি ও মিথ্যা দলিল দাখিল শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
আইনজীবীদের মতে, নাগরিকত্ব ত্যাগের বৈধ প্রমাণ ছাড়া মনোনয়ন দাখিল করা এবং হলফনামায় অসত্য তথ্য দেওয়া হলে প্রার্থিতা বাতিল হওয়া বাধ্যতামূলক। ডিসি কার্যালয়ের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন স্থানীয় সূত্র জানায়, নাগরিকত্ব ত্যাগের কোনো দলিল জমা না দিলেও মুশফিকুর রহমানের মনোনয়ন গ্রহণ করা হয়েছে। এতে প্রশাসনের ভূমিকা এবং যথাযথ যাচাই নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
নাগরিকত্ব গ্রহণের উদ্দেশ্য নিয়েও আলোচনা
স্থানীয়ভাবে আলোচিত হচ্ছে, মুশফিকুর রহমান কানাডার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছিলেন মূলত বয়স্ক ভাতা, বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং দীর্ঘমেয়াদি আবাসন সুবিধা পাওয়ার জন্য। অথচ নির্বাচনের সময় তিনি নিজেকে একমাত্র বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন—যা নৈতিকতা ও আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মত সংশ্লিষ্ট মহলের।
উপসংহার কানাডিয়ান পাসপোর্ট ব্যবহার, নাগরিকত্ব ত্যাগের অসঙ্গত দাবি, সমর্থনকারী নথির অনুপস্থিতি এবং পূর্বের আইনি নজির—সব মিলিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া–৪ (কসবা–আখাউড়া) আসনে মুশফিকুর রহমানের মনোনয়ন নিয়ে গুরুতর আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। এখন বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

