
শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে প্রকৃতিতে শুরু হয়েছে অতিথি পাখির আনাগোনা। এরই মধ্যে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার কলেজ মোড়ের একটি বিশাল আকৃতির রেইনট্রি গাছসহ আশপাশের কয়েকটি গাছে আশ্রয় নিয়েছে হাজারো অতিথি পাখি। পাখির কলকাকলি ও ডানা মেলার অপরূপ দৃশ্যে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাখির কিচিরমিচির শব্দে মুখর থাকে কলেজ মোড়। এসব পাখি দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ।
কলেজ মোড়ের বিশাল রেইনট্রি গাছের মগডালে শত শত পাখির বাসা। গলায় কালো ডোরাকাটা ও সাদা রঙের এসব পাখি দলবেঁধে এক ডাল থেকে অন্য ডালে উড়ে বেড়ায়। কখনো খাবারের সন্ধানে ছুটে যায় দূরে, আবার কখনো দলবেঁধে ফিরে আসে আপন ঠিকানায়। পাখির কলকাকলি আর উড়ে বেড়ানোর দৃশ্য যেন প্রকৃতির বুকে আঁকা এক অপরূপ চিত্রকর্ম।
পৌর শহরের ফলের দোকানদার মমিনুল ইসলাম জানান, প্রায় এক বছর আগে একঝাঁক অচেনা পাখি এসে গাছটিতে আশ্রয় নেয়। এরপর ধীরে ধীরে আশপাশের গাছগুলোতেও পাখির সংখ্যা বাড়তে থাকে। বর্তমানে হাজারো পাখি এসব গাছে বাসা বেঁধেছে। প্রতিটি বাসায় রয়েছে অসংখ্য ছানা। সারাদিন উপজেলা পরিষদের পেছনের খাল ও তিস্তা নদী এলাকায় গিয়ে খাবার সংগ্রহ করে সন্ধ্যার আগে আবারও গাছের ডালে নিজেদের বাসায় ফিরে আসে পাখিগুলো। পাখির কিচিরমিচির শব্দ এখন মোড়ের ব্যবসায়ীদের নিত্যদিনের সঙ্গী। তবে এখন পর্যন্ত পাখি শিকারি কিংবা অন্য কোনো পক্ষের অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ থেকে পাখিগুলো নিরাপদ রয়েছে। এ ব্যাপারে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
পাখি দেখতে আসা মো. জিল্লুর রহমান বলেন, একসময় গ্রাম-গঞ্জের মাঠঘাটে প্রচুর বড় বড় গাছ ছিল। সেসব গাছে দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির পাখি বাসা বাঁধত। কালের বিবর্তনে বড় গাছ কমে যাওয়ায় পাখির আনাগোনাও অনেক কমেছে। ৩০-৪০ বছর আগে শীত মৌসুমে অতিথি পাখির উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। দীর্ঘদিন পর সুন্দরগঞ্জের একটি গাছে এত পাখি দেখে তাঁর খুব ভালো লাগছে।
আরেক দর্শনার্থী তাহসিন আহম্মেদ বলেন, পাখির কিচিরমিচির শব্দ তাঁকে মুগ্ধ করেছে। অতিথি পাখিরা আমাদের প্রকৃতির সম্পদ। তাদের নিরাপদে বসবাসের পরিবেশ নিশ্চিত করা সবার নৈতিক দায়িত্ব। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় এসব পাখির আগমন এলাকার জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। কিছুক্ষণের জন্য হলেও পাখির কলকাকলি মনকে আনন্দে ভরিয়ে দেয়।
সুন্দরগঞ্জ আমিনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. জহুরুল হক বলেন, অতিথি পাখিরা একটি গাছকে নিজেদের নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে বেছে নিয়েছে, এটি আনন্দের বিষয়। প্রায় এক বছর ধরে প্রতিদিন সকালে বাড়ির বারান্দা থেকে পাখিগুলোকে দেখেন তিনি। পাখির কিচিরমিচির শব্দ ও ডানা মেলে উড়ে বেড়ানোর দৃশ্য তাঁকে মুগ্ধ করে। আগেও শীতের শুরুতে এসব পাখি এসেছিল, তবে এবার সংখ্যায় অনেক বেশি। এলাকাবাসীও পাখিগুলোর নিরাপত্তা রক্ষায় আন্তরিক ভূমিকা পালন করছেন।
শোভাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. মশিউর রহমান বলেন, শীত মৌসুমের শুরুতে কিংবা তার কিছু আগে শীতপ্রধান দেশ, বিশেষ করে সাইবেরিয়া অঞ্চল থেকে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি বাংলাদেশে আসে। খাদ্যের প্রাপ্যতা, প্রজনন ও অনুকূল পরিবেশের কারণে এসব পাখি এ দেশে অবস্থান করে। উপযুক্ত পরিবেশ ফিরে এলে তারা আবার নিজ আবাসস্থলে ফিরে যায়। এসব পাখির মধ্যে বালিহাঁস, হারগিলা, সাইবেরিয়ান বকসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি থাকতে পারে। এরা সাধারণত বিল, খাল ও নদী থেকে শামুক, ছোট মাছ ও পোকামাকড় খেয়ে জীবনধারণ করে।
উপজেলা বন বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান বলেন, সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় বড় আকৃতির গাছের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। কিছু এলাকায় এখনো হাতেগোনা কয়েকটি বড় গাছ রয়েছে। সাধারণত শীত মৌসুমে অতিথি পাখিরা এসে এসব গাছে সাময়িকভাবে বসবাস করে। পাখিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শিকার বন্ধে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।
প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে অতিথি পাখির নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করা জরুরি। সুন্দরগঞ্জের কলেজ মোড়ের এই রেইনট্রি গাছটি এখন শুধু পাখিদের আশ্রয়স্থল নয়, বরং প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের জন্যও হয়ে উঠেছে এক আকর্ষণীয় স্থান। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, অতিথি পাখিদের এই নিরাপদ আবাসস্থল অক্ষত থাকবে এবং তাদের কলকাকলিতে মুখর থাকবে সুন্দরগঞ্জের আকাশ।
সম্পাদক- আবদুর রহমান
০১৩০৩১১২৬৭৬
Web:https://bangladeshamar.com/ Email: doinikbangladeshamar@gmail.com
Address: F-8, KA-90,JHK WINDCEL, KURIL KAZI BARI,VATARA,DHAKA-1229.
Copyright © 2026 বাংলাদেশ আমার. All rights reserved.