ওমর ফারুক
বিজয় কর রতন, মিঠমইন (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধিঃ
কিশোরগঞ্জে গরম থেকে বাঁচতে সোমবার দুপুরে একটি বেওয়ারিশ কুকুরকে দীর্ঘ সময় ঝিলের পানিতে অবস্থান করতে দেখা গেছে।
কিশোরগঞ্জে তিন দিন ধরে তীব্র দাবদাহ আর ভ্যাপসা গরমে বিপর্যয় হয়ে পড়েছে জনজীবন। দাবদাহে কর্মজীবী মানুষের কষ্ট চরমে পৌঁছেছে। এ গরমে ভালো নেই প্রাণীরাও। গরম থেকে রেহাই পেতে পুকুরের পানিতে বিভিন্ন প্রাণীকে সময় কাটাতে দেখা গেছে।
বিশেষ করে বেওয়ারিশ কুকুরদের অবস্থা বেগতিক। এ ছাড়া গৃহপালিত পশু-পাখি হাঁস, মুরগি, গরু, ছাগল ও পাখিরা রয়েছে চরম অস্বস্থিতে। দাবদাহ বাড়তে থাকায় তাদের মাঝে দেখা দিচ্ছে পানিশূন্যতা, নানা ধরনের রোগ।
এসব কারণে অধিকাংশ প্রাণীর মধ্যে আচরণগত পরিবর্তনও লক্ষ করা যাচ্ছে। তীব্র গরমে বাড়ছে হিট স্ট্রোকের মতো স্বাস্থ্যঝুঁকি। ডায়রিয়ায়ও আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে।
রিকশাচালক, ভ্যানচালক থেকে শুরু করে বিভিন্ন পেশার শ্রমজীবী ও দিনমজুররা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। শুক্রবার (১৯ এপ্রিল) দুপুরে শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সূর্যের প্রখর তাপে বিপর্যন্ত হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের জীবন।
প্রচন্ড রোদে ঘর থেকে বের হতে পারছে না শ্রমিক-দিনমজুরসহ খেটে খাওয়া মানুষ। সামান্য স্বস্তি ও একটু শীতল পরিবেশের জন্য সবাই ছুটছেন গাছের ছায়ায়। অতিরিক্ত গরমে শিশুসহ বিভিন্ন বয়সি মানুষ শরবত ও পানীয়ের দোকানে ভিড় করছেন।
গরমে কুকুর, বিড়ালসহ বিভিন্ন ধরনের প্রাণী স্বস্থি খুঁজছে নিজস্ব আবহে। সোমবার দুপুরে দীর্ঘক্ষণ ঝিলের পানিতে ডুব দিতে দেখা যায় বেওয়ারিশ একটি কুকুরকে। গরম তাড়াতেই যে ওদের পানিতে নেমে পড়া, তা খুব সহজেই বোঝা যাচ্ছিল।
অনেকেই রাস্তা থেকে মোবাইলে ছবি তুলছিল কুকুরটির। জেলা শহরের একরামপুরে রিকশাচালক কামাল হোসেন জানান, এমন কড়া রোদে রিকশা চালানো কষ্ট হচ্ছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তাঘাটে মানুষজন কম চলাচল করছে। অনেকে প্রয়োজন ছাড়া বাসা-বাড়ি থেকে বের হচ্ছে না।
গত দুই দিন থেকে বিকালে রিকশা নিয়ে বের হন তিনি। মোটরসাইকেলের চালক সাগর মিয়া বলেন, এ রোদে মোটরসাইকেল চালাতে কষ্ট হয়। কিন্তু জীবিকার তাগিদে প্রতিদিনই বের হতে হয়।
বেসরকারি চাকরিজীবী রাজীব সরকার বলেন, বাইরে তো গরমের জন্য এক ঘণ্টাও থাকা যায় না। বাসায়ও গরমে নাজেহাল অবস্থা। মাথার ওপর ফ্যান ঘোরে, কিন্তু সেই বাতাসও গরম। দিনের বেলা ট্যাপ থেকে যেন ফুটন্ত পানি বের হয়।
একটু বৃষ্টি যে কবে নামবে সেই অপেক্ষায় আছি। কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা যশোদল নোয়াপাড়া গ্রামের গৃহবধূ রিতু আক্তার জানান, গরমের মাঝে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি।
বিশেষ করে ছেলেমেয়েদের এ সময় ফ্যানের বাতাস না পেয়ে ত্রাহি অবস্থার সৃষ্টি হয়। বাসায় বাসায় এখন জ্বরের প্রকোপ দেখা দিয়েছে। গরমে সেসব রোগীদের নিয়ে নাজুক পরিস্থিতিতে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে।
জেলা আবহাওয়া অফিস জানান, তিন দিন থেকে এ অঞ্চলের তাপমাত্রা ৩৪-৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠানামা করছে। আগামী ২-৩ দিন এ অবস্থা বিরাজ করবে। তীব্র গরমে প্রচুর পানি ও খাবার স্যালাইন খাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রবা ফটোকিশোরগঞ্জ শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার জানান, ‘আবহাওয়া পরিবর্তনের এ সময়ের গরমে রোগ-বালাই থেকে বাঁচতে রাস্তার পাশে খোলা খাবার এবং অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। শেষ রাতের ঠান্ডায় ফ্যান কিংবা এসি না চালানোয় ভালো।
প্রচুর পানি ও খাবার স্যালাইন খাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।’কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এবিএম জালাল উদ্দিন এ প্রতিনিধিকে বলেন, ‘আমাদের সার্বক্ষণিক মনিটরিং অব্যাহত রয়েছে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে চলমান প্রশিক্ষণে এ ব্যাপারে পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে। যেখানে পশুপাখিদের বিচরণ রয়েছে এমন এলাকায় ছায়াযুক্ত জায়গায় পানি রাখার জন্য জনসাধারণের প্রতি অনুরোধ করা হয়েছে। যদি সম্ভব হয় সেই পানিতে লেবুর রস দেওয়ার জন্য পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে।
বিশেষ করে আগামী কোরবানিকে কেন্দ্র করে গরুএবং ছাগল খামারিদের খামারে ফ্যানের পাশাপাশি প্রাকৃতিকভাবে বাতাস প্রবেশ করে সেই ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে। কোথাও কোনো ধরনের সমস্য সৃষ্টি হলে দ্রæত উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
’সিভিল সার্জন ডা. মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রচন্ড গরম তাপের প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় দৈনন্দিন খেটে খাওয়া মানুষকে সাবধানে খরতাপ উপেক্ষা করে কাজ করতে বলা হয়েছে। তা না হলে হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’ এদিকে সোমবার দেশের সর্বোচ্চ ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে রাঙামাটিতে।
আগের দিন রবিবারও সেখানে একই তাপমাত্রা ছিল। সোমবার দেশের সর্বনিম্ন ২১ দশমিক ৪ ডিগ্রি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে তেঁতুলিয়াতে।

