আবদুর রউফ আশরাফ
নিজস্ব প্রতিবেদক

ছাত্র আন্দোলন ও শিক্ষকদের দ্বন্ধের কারণে উপজেলা সদরের সবচেয়ে বড় বিদ্যাপীঠ ঐতিহ্যবাহী বানিয়াচং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়টি এখন অস্থিত্ব সংকটে পড়েছে। আন্দোলন ঠেকাতে ৩ জন শিক্ষককে বাধ্যতামুলক ছুটিতে রাখা, শিক্ষার্থী কমে যাওয়া ও সঠিক নেতৃত্বের অভাবে দিন দিন বিদ্যালয়টি সুনাম হারাচ্ছে। সরকার পুরাতন কমিটি বিলুপ্ত করায় এডহক কমিটি গঠনের জন্য সরকারী নির্দেশনা থাকলেও এখন পর্যন্ত পুরাতন কমিটিই বহাল আছে।

প্রতিষ্ঠানের সুনাম ধরে রাখতে প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা গতকাল (সোমবার) ইউএনওর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন।
৫ আগস্টের পর বিদ্যালয়ের সভাপতি হায়দারুজ্জামান খান ধন মিয়া পালিয়ে যান।

২ সেপ্টেম্বর প্রধান শিক্ষকসহ কয়েকজন শিক্ষকের পদত্যাগের দাবীতে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। দিনভর পরিস্থিতি সামাল দিয়ে ব্যর্থ হলে সেনাবাহিনী ও উপজেলা প্রশাসন অভিভাবকদের সাথে আলোচনা করে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পারভীন আক্তার খানম, সহকারী প্রধান শিক্ষক শিরিন আক্তার ও সহকারী শিক্ষক নানু মিয়াকে বাধ্যতামুলক ছুটিতে পাঠায়।

গণ স্বাক্ষর দিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা চাকুরী থেকে বরখাস্তের জন্য তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার , ৮কোটি টাকা তছরুপ ও শিক্ষার্থীদের সাথে দূর্ব্যবহারের অভিযোগ দেয়। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এরপর গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে তারা প্রতিষ্ঠানে না এলেও প্রধান শিক্ষক পারভীন আক্তার খানম বাড়ি থেকেই অফিসিয়াল কাগজপত্রে স্বাক্ষর করে যাচ্ছেন।


এদিকে শিক্ষার্থী সংখ্যা কমে যাওয়ায় খন্ডকালীন শিক্ষক ছাঁটাই হতে পারে এমন প্ররোচনা পেয়ে খন্ডকালীন শিক্ষকরাও গ্রুপিংয়ে যুক্ত হয়। এর জের গত 29 এপ্রিল কিছু বহিরাগত লোক বিদ্যালয় ছুটির প্রাক্ষালে সকল শিক্ষার্থীকে প্রায় দুই ঘন্টা অবরোধ করে রাখে। তারা বিদ্যালয়ের ৩টি গেইট তালাবদ্ধ করে শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে।

শিক্ষার্থীরা বাড়ি ফিরতে দেরী করায় অভিভাবকরা খুঁজতে এসে তাদের মুক্ত করেন। এর আগে কয়েক বার প্রধান শিক্ষকের পক্ষে বিপক্ষে শিক্ষার্থীরা মারমুখী আচরণ করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে সঠিক নেতৃত্বের অভাবে হারাচ্ছে শিক্ষার পরিবেশ।
অমি নামে ৭ম শ্রেনির এক শিক্ষার্থী তার বাবাকে অনুরোধ করেছে তাকে যেন অন্য স্কুলে ভর্তি করা হয়। সে জানায় তার শাখায় ১১১ জন শিক্ষার্থী আছে।

আন্দোলনের কারনে তার সহপাঠি তাকিয়া,নিহা ,নাবিহা,অমি রিয়া পাল সহ আরো কয়েকজন অন্য স্কুলে চলে গেছে। নবন শ্রেনির শিক্ষার্থী তাসিন বলেন, এই অবস্থার কারণে ভালো লাগে না, তাই স্কুলে আসতে মন চায় না।

কামাল খানী মহল্লার প্রাক্তন ছাত্র ও বর্তমান অভিভাবক ইউপি সদস্য মখলিছুর রহমান জানান স্কুলের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেছে তাই তার সপ্তম শ্রেনি পড়ুয়া মেয়ের টিসি নিয়ে পার্শ্ববর্তী একটি স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন।


অফিস সহকারী পারভীন বেগম জানান ২০২৪ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ছিল ১হাজার ৮৩৮ জন, চলতি বছর শিক্ষার্থী কমে ১হাজার ৪০০জন। শাখা ৩টি কমে ১৮টি শাখা চলমান আছে। কর্মরত শিক্ষক আছেন ২৯ জন। এদের মধ্যে ৮ জন খন্ডকালীন শিক্ষক রয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক জানিয়েছেন, শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সবার আগে টিউশন বানিজ্য বন্ধ করতে হবে। টিউশন করার সময় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মগজ ধূলাই করে তাদেরকে দিয়ে প্রতিপক্ষ শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়।


নৈশপ্রহরী জানু মিয়া বলেন চলতি মাসেই তিনি অবসরে যাবেন। যাওয়ার সময় সত্যি বলতে চান। তিনি কয়েকজন শিক্ষকের নাম উল্লেখ করে বলেন তারাই দলাদলিতে যুক্ত। শিক্ষকরা ঠিক হলে স্কুল ঠিক হয়ে যাবে।


উপজেলা নির্বাহী অফিসারের মৌখিক আদেশে বিদ্যালয়ের রুটিং কাজ পরিচালনা করছেন সিনিয়র শিক্ষক গোলাম রব্বানী। তিনি বলেন কেউ দোষ করে থাকলে প্রচলিত আইনে বিচার হবে।

ম্যানেজিং কমিটিকে সাথে নিয়ে তাদের স্কুলে ফেরাতে আন্দোলন করেছি কিন্তু প্রশাসন পরিস্থিতি বিবেচনায় সায় দেয়নি। গোলাম রব্বানী আরো বলেন, কারো সাথে ব্যক্তিগত দ্বন্ধ নেই তবে যে ৩জন শিক্ষক বিদ্যালয়ে ঢুকতে পারছেন না তারাই গ্রুপিং ও আন্দোলনের জন্য দায়ী।

প্রধান শিক্ষক পারভীন আক্তার খানম বলেন আতাউর রহমান নামে একজন খন্ডকালীন শিক্ষককে ছাত্রীদের অভিযোগের ভিত্তিতে কর্তৃপক্ষ স্কুল থেকে বরখাস্ত করে । সে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারী থেকে মে মাস পর্যন্ত কর্মরত ছিল। এরপর সে প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে উঠে। ৫ আগস্টের আবেগকে পুঁজি করে আন্দোলন করে ।

আর্থিক অনিয়ম বা দূর্নীতি প্রসংগে তিনি বলেন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি কিছু টাকা হাওলাত নিয়েছিলেন পরে তিনি সেই টাকা পরিশোধ করেছেন। তিনি বলেন সত্য একদিন প্রকাশ হবে। গ্রুপিং ও আন্দোলনের অভিযোগ নাকচ করে বলেন কেউ কারো সম্মানহানী করলে প্রকৃতির নিয়মেই সে একদিন বিচারের মুখোমুখি হবে।


উপজেলা একাডেমিক সুপার ভাইজার সম্পদ কান্তি দাশ তালুকদার বলেন, সুন্দর একটি স্কুল চোখের সামনে জৌলুস হারাচ্ছে। স্কুলের প্রতি নজর দেয়ার জন্য এলাকাবাসী ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে তিনি জানান।


ইউএনও মাহমুদা বেগম সাথী জানান, কেউ ছুটিতে নয়, নিরাপত্তার কারণে ৩জন শিক্ষককে স্কুলে আসতে বারণ করা হচ্ছে। তিনি বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থীদের বলেছেন, তিনিও চান বিদ্যালয়ের সমস্যা দূর হউক। কিন্তু যার মাধ্যমে কাজ করবেন সেই প্রধান শিক্ষকতো স্কুলেই যেতে পারছেন না। তিনি দ্রুত এডহক কমিটি গঠনের তাগিদ দিয়েছেন।

জেলা প্রশাসনের তদন্তকারী কর্মকর্তা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মোঃ জাহিদুল ইসলাম জানান অভিযোগ সম্পর্কে………!


উল্লেখ্য ১৯৮৫ সালের ২৪ জানুয়ারী সাবেক রাষ্ট্রপতি নিজ নামে হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ উচ্চ বিদ্যালয় নামে প্রতিষ্ঠিত হয় বিদ্যালয়টি। পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে নাম পরিবর্তিত হয়ে “বানিয়াচং আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়” নাম ধারণ করে। কয়েক বছর আগেও ২হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছে।