মেহেদী হাসান
নিজস্ব প্রতিবেদক

নরসিংদীর শিবপুর উপজেলায় ৮ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে প্রতিবেশী এক মধ্যবয়সী ব্যক্তির বিরুদ্ধে। শুক্রবার (২৬ সেপ্টেম্বর) দুপুরে শিবপুর উপজেলার পুটিয়া ইউনিয়নের একটি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে বলে জানা গেছে।

পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় ধর্ষক জাকির মুন্সি বাড়িতে ডেকে নিয়ে শিশুটিকে ধর্ষণ করে। ঘটনার পর ভয় দেখিয়ে শিশুটিকে বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে শিশুর মা রক্তক্ষরণ দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে পুরো ঘটনাটি জানায় সে।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন দুপুরে প্রতিবেশী জাকির মুন্সি শিশুটিকে দোকান থেকে সিগারেট আনার কথা বলে তার মায়ের কাছ থেকে ডেকে নেয়। পরে শিশুটিকে নিজের বাড়ির একটি কক্ষে নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ করে ভুক্তভোগী।

অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুটি ভয়ে ও ব্যথায় চিৎকার করলে পাশের বাড়ির কুলসুম নামের এক নারী ছুটে আসেন। তবে তিনি কিছু বুঝে ওঠার আগেই জাকির মুন্সি শিশুটিকে খাটের নিচে লুকিয়ে রাখে বলে জানা গেছে।

কুলসুম চলে গেলে শিশুটিকে তড়িঘড়ি করে কাপড় পরিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয় অভিযুক্ত জাকির মুন্সি।
এরপর থেকেই শিশুটি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এবং শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে বলে জানান পরিবার ও স্থানীয়রা। সর্বোপরি ইতি পূর্বেও কয়েকবার শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয় এই জাকির মুন্সি।

শিশুর মা জানান, “আমার মেয়ের কাপড় রক্তে ভিজে ছিল। ও খুব কাঁদছিল। পরে সব খুলে বলে। আমি সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবেশীদের নিয়ে ধর্ষক জাকির মুন্সির বাড়িতে যাই, কিন্তু তখন সে পালিয়ে যায়।”

এ ঘটনার বিষয়ে ধর্ষক জাকির মুন্সির বাড়িতে তার পরিবার ও প্রধান সাক্ষী প্রতিবেশী কুলসুমের সাক্ষাৎ নিতে সাংবাদিকরা গিয়ে দেখেন। ধর্ষক জাকিরের বাড়ি তালা বন্ধ এবং ঘটনার প্রধান সাক্ষী কুলসুম বাড়িতে নেই । সাংবাদিকদের আসার কথা শুনে তারা পালিয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ধর্ষণের এই লোমহর্ষক ঘটনাটি শুরুতে গোপন রাখার চেষ্টা চলে। প্রভাবশালী একটি মহল নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করে বিষয়টি আড়াল করার উদ্যোগ নেয়।

অভিযোগ রয়েছে, এক জনপ্রতিনিধির পরামর্শে শিশুটিকে হাসপাতালে না নিয়ে স্থানীয় ইটাখোলা এলাকায় ‘ভাই ভাই ফার্মেসি’-তে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গাইনী ডাক্তার পরিচয়ে এক নারী শিশুটির জন্য কোনো প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ব্যথানাশক ও ইনফেকশনরোধী সহ চার ধরনের ওষুধ কেনেন। পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় কিছু অর্থ বাকিতে রেখে ওষুধ দেওয়া হয় গাইনি ডাক্তার পরিচয়দানকারী নারীর কথায়।

পরবর্তীতে সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে জানা যায়, ‘গাইনী ডাক্তার’ পরিচয়দানকারী ওই নারী আসলে একজন জনপ্রতিনিধি—পুটিয়া ইউনিয়নের সংরক্ষিত মহিলা আসনের ইউপি সদস্য। স্থানীয়রা জানান, তিনি পেশায় ডাক্তার নন; বরং আগে একটি ফার্মেসি পরিচালনা করতেন এবং নিজেকে মাঝে মাঝে ‘নার্স’ পরিচয়ে পরিচিত করাতেন।

ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার কারণে শিশুটির শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। রক্তপাত বেড়ে গেলে তিন দিন পর পরিবার বাধ্য হয়ে শিশুটিকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে ভর্তি করে।

হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, শিশুটি গুরুতর শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও আইনি আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে।

এদিকে, স্থানীয়দের দাবি— ঘটনার পর থেকেই ধর্ষকের পক্ষ নিয়ে ধামাচাপার চেষ্টা চলছে। তারা এর বিচার দাবি করে মানববন্ধনও করেছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শিশুটির পরিবারটি চরমভাবে অসহায়। পিতা শারীরিক প্রতিবন্ধী— জীবিকার জন্য অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করেন এবং পাশের একটি বেসরকারি কিন্ডারগার্টেনে খণ্ডকালীন দপ্তরির দায়িত্বে থেকে পরিবারের সংসার টানেন কষ্টে ভরা জীবনে।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই পুরো এলাকায় নেমে আসে তীব্র ক্ষোভের ঝড়। স্থানীয়রা জড়ো হয়ে ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সরব হন। তারা বলেন— “এমন নৃশংস ঘটনার বিচার না হলে, সমাজে কোনো শিশুই নিরাপদ থাকবে না।”
এলাকার সর্বস্তরের মানুষ এখন একবাক্যে দাবি তুলেছেন— নির্দোষ শিশুটির প্রতি এই পৈশাচিক বর্বরতার ন্যায়বিচার হোক, অপরাধী যেন আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি পায়।

ঘটনাটিকে নিন্দনীয় উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা শিবপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আফজাল হোসেন জানান, “এটি শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। তদন্তে যারা জড়িত প্রমাণিত হবে, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। শিশুর ক্ষেত্রে কোনো ছাড় নেই— সে আমার সন্তান হোক বা অন্য কারও।”

তিনি আরও বলেন, “আইনের চোখে সব শিশুই সমান, এবং প্রতিটি শিশুই নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার অধিকার রাখে। তাই আমরা নিশ্চিত করব, এই ঘটনায় ভুক্তভোগী শিশু যেন ন্যায়বিচার পায় এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি না ঘটে।”

এ ঘটনায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয়রা অভিযুক্তের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।