বিজয় কর রতন
মিঠামইন (কিশোরগঞ্জ) প্রতিনিধি

কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার কলমা ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারকে কেন্দ্র করে ভাতাভোগীদের ওপর চলছে ভয়াবহ অনিয়ম, অবৈধ অর্থ আদায় ও প্রতারণার অভিযোগ। সেন্টারের উদ্যোক্তা শ্যামল চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে ভাতা আবেদন থেকে শুরু করে বিকাশ অ্যাকাউন্ট খোলা এবং ব্যাংক এশিয়া এজেন্ট ব্যাংকিং পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সাধারণ মানুষের পকেট কাটার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

কলমা, চন্ডিপুর, সাপান্ত ও হালালপুরসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের ভাতাভোগীরা দীর্ঘদিন ধরে হয়রানির শিকার হলেও ভয়ে মুখ খুলতে পারেননি। এ ব্যাপারে সাবেক উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা মোছাঃ দিলসাদ বেগমের নিকট গ্ৰামবাসী দুটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। ‎ ‎

সরজমিনে গত ১৩ ই ডিসেম্বর শনিবার অষ্টগ্রাম উপজেলার কলমা ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে এ চিত্র চোখে পড়ে। উপস্থিত ভোক্তভুগিরা জানান, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা,গর্ভবতী ভাতার আবেদন করতে গেলে শ্যামল চন্দ্র দাস ১,০০০ টাকা ‘আবেদন ফি’ দাবি করেন, যা সম্পূর্ণ বেআইনি।

পাশাপাশি ভাতার টাকা উত্তোলনের সুবিধার কথা বলে বিকাশ অ্যাকাউন্ট খুলতে হয় শ্যামলের নিজ দোকান থেকে ৫০০ টাকায় সিম কিনে। অন্য দোকানের সিম গ্রহণ না করার হুমকিও দেওয়া হয়। ‎ ‎

আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, বিকাশ অ্যাকাউন্ট খোলার সময় ভাতাভোগীর সিম কার্ড নিজের কাছে রেখে দেন শ্যামল এবং পাসওয়ার্ডও নিজেই সেট করেন। ফলে ভাতার টাকা অ্যাকাউন্টে জমা হলে প্রথমেই তিনি টাকা উত্তোলন করেন। পরে ইন্দ্রজিৎ মেম্বারের মাধ্যমে সিম ভাতাভোগীর হাতে পৌঁছে দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। ‎ ‎ব্যাংক এশিয়া এজেন্ট ব্যাংকিং সেবায়ও নতুন কৌশলে হয়রানি করা হয়।

ভাতাভুগীরা জানান, অ্যাকাউন্টে ১,০০০ থেকে ৩,০০০ টাকার কম ব্যালেন্স থাকলে উত্তোলন করা যাবে না বলা হয়। তবে ‘কিছু দিলে’ সেই নিয়ম তখনই ভেঙে যায়। এতে সাধারণ মানুষ আরও চাপে পড়ে। ‎ ‎

স্থানীয় বাসিন্দা উজ্জ্বল দাস, বিকাশ দাস, রামেস্বর দাস, নেতা রানী দাস সহ একাধিক  ভাতাভোগী বলেন, “আমরা গরীব মানুষ। ভাতা পাইলে সংসার চলে। কিন্তু আবেদন, সিম কিনা, টাকা তোলা, সব জায়গাতেই টাকা লাগে। না দিলে কোনো কাজ হয় না।” ‎ ‎

এদিকে অভিযোগ অনুসন্ধানে গিয়ে নতুন চিত্র সামনে আসে। শ্যামল চন্দ্র দাস সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করেন এবং ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারকে রাজনৈতিক কার্যালয় দাবি করেন। একইসঙ্গে সদরের কয়েকজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিকে ফোন করে সাংবাদিকদের ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টা করেন বলেও জানা গেছে। তার এই আচরণে প্রশ্ন আরও গভীর হয়েছে। ডিজিটাল সেন্টারের আড়ালে কি কোনো রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় চলছে এই ভাতা সিন্ডিকেট? ‎ ‎

মোহনতলা বাজার কমিটির সভাপতি কৃষ্ণনন্দ দাস শ্যামল চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে উত্থাপিত এসব অভিযোগকে সত্য উল্লেখ করে তাকে দ্রুত পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন এলাকার সচেতন নাগরিক, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও ভুক্তভোগীরা। তাদের দাবি, ডিজিটাল সেন্টারে একজন সৎ ও দক্ষ উদ্যোক্তা নিয়োগ দিতে হবে এবং সকল অনিয়ম নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। ‎ ‎

কলমা ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোঃ এরশাদ উদ্দিন জানান, এসব ঘটনা অহরহ হচ্ছে। এরকম হয়রানি এখন কলমা ইউনিয়নের নিত্যদিনের ঘটনা। শ্যামল এর বিষয়ে এসব অভিযোগের কথা কে না জানে। কিছুদিন আগেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (সদ্য বিদায়ী) মোছাঃ দিলশাদ জাহান এর কাছে এ বিষয়ে ২ টি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) স্যার বদলী হওয়ায় এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার সময় পাননি। ‎কলমা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাধাকৃষ্ণ দাস বলেন, ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোক্তা শ্যামল চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ চরম পর্যায়ে, আমাকে অনেক ভাতাভূগী মৌখিক ভাবে বিষয়টি জানিয়েছেন তবে আমার কাছে কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি।

উজ্জ্বল দাস এবং বিকাশ দাস নামে ২ জন ব্যাক্তি সদ্য বিদায়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোছাঃ দিলশাদ জাহানের কাছে জমা দিয়েছে কিন্তু ইউএনও স্যার বদলী জনিত কারণে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের সময় পাননি। আমরা চাই উপজেলা প্রশাসন এবিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে শ্যামল চন্দ্র দাসের দুর্নীতি আরো চরম পর্যায়ে পৌঁছাবে। ‎ ‎

এবিষয়ে অষ্টগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সিলভিয়া স্নিগ্ধার সাথে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি অষ্টগ্রাম উপজেলায় নতুন জয়েন করেছি এবিষয়ে আমি এখনো অবগত হয়নি। আমি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব। ‎ ‎

অভিযোগগুলোর তদন্ত ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বন্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।