
ওমর ফারুক
নরসিংদীর মাধবদীতে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসা বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের নেতা, মাধবদী পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ছাত্র হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি পরিমল ঘোষ ওরফে কেশব বাবুর বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ উঠে এসেছে।
স্থানীয়দের দাবি, জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে নানা মহলের সঙ্গে লিয়াজো বজায় রেখে এখনো এলাকায় প্রভাব খাটাচ্ছেন তিনি এবং তার দৌরাত্ম্যের শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
অভিযোগ রয়েছে, মাধবদী পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পর থেকেই কেশব ঘোষ এলাকায় একটি অপ্রতিরোধ্য বলয় তৈরি করে নানা ধরনের নির্যাতন ও প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। প্রায় আড়াই যুগ পার হলেও তার প্রভাব বলয়ের কারণে এলাকার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।
কেশব ঘোষের প্রতিষ্ঠিত একটি মিষ্টির দোকান নিয়েও রয়েছে নানা অনিয়ম ও হয়রানির ঘটনা। তার ছেলেরা প্রায়ই ক্রেতাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন।
অনেক সময় কোনো ক্রেতা মিষ্টি কিনতে চাইলে দোকানের একজন বিক্রি করতে গেলেও তাদের আরেকজন এসে বাধা দিয়ে বলেন, “এটা আগেই বিক্রি হয়ে গেছে।” ফলে ক্রেতারা অযথা হয়রানির শিকার হন।
এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, মিষ্টি তৈরির জন্য দুধ সংগ্রহ করতে যে মধ্যস্থতাকারীরা দুধ কিনে সরবরাহ করেন, তাদের অনেকের পাওনা টাকা দীর্ঘদিন ধরে আটকে রেখেছেন কেশব ঘোষের ছেলে পলাশ ঘোষ ও বিকাশ ঘোষ।
স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ, তার দুর্নীতি ও নানা অনিয়মের খবর সংগ্রহ করতে গেলে কেশব ঘোষের ছেলে পলাশ ও বিকাশ সাংবাদিকদের সঙ্গে ‘মববাজি’ করার চেষ্টা করেন। বাবার প্রভাব বলয় রক্ষায় তারাও সমানভাবে সক্রিয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে নরসিংদীর মাধবদীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণের অভিযোগে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ এই নেতা পরিমল ঘোষ ওরফে কেশব বাবুর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে। ঘটনার তদন্ত শেষে তাকে আদালতে পাঠানোর জন্য পুলিশ প্রতিবেদন দাখিল করেছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, নরসিংদীর মাধবদী থানায় দায়ের করা একটি মামলায় দণ্ডবিধি ১৮৬০ এর ১৪৩/১০৯/৩২৬/৩৪ ধারায় পরিমল ঘোষ (৬০) ওরফে কেশব বাবুকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তিনি মাধবদী শহরের বাসিন্দা এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে।
মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে, গত বছরের কোটা সংস্কার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হলে নরসিংদীর মাধবদীতেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচি পালিত হয়।
২১ সেপ্টেম্বর দুপুরে মাধবদী পৌরসভার সামনে শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় পরিমল ঘোষের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী লাঠিসোটা ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঘটনাস্থলে এসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। এতে ঘটনাস্থলে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন।
মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, হামলার এক পর্যায়ে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এতে পরিমল ঘোষের সহযোগীদের গুলিতে এক শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন। পরে তাকে প্রথমে নরসিংদী সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
ঘটনার পর আহত শিক্ষার্থীর পরিবার মাধবদী থানায় মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে জানায়, মামলার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঘটনার সময় স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তির উপস্থিতি ও উসকানির বিষয়টিও তদন্তে উঠে এসেছে। ফলে ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এদিকে মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত পরিমল ঘোষ ওরফে কেশব বাবুকে জেল হাজতে আটক রাখা প্রয়োজন বলে আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু শারীরিক অসুস্থতার অজুহাতে পরিমল ঘোষ এখন জামিনে রয়েছেন একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।

