বিশেষ প্রতিনিধি
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হতে এখনো প্রায় ছয় মাস বাকি। তবে এর আগেই কমিটি ভেঙে মহাসচিবসহ শীর্ষস্থানীয় পদগুলোয় রদবদল আনতে যাচ্ছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে দলীয় পর্যালোচনা ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ দলের কেন্দ্রীয় কমিটি আগাম পুনর্গঠনের পথে হাঁটছে। এ বিষয়ে আগামীকাল শনিবার অনুষ্ঠেয় দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম মজলিশে শুরার বৈঠকে সিদ্ধান্ত হতে পারে। দলীয় একাধিক সূত্র প্রথম আলোকে এ তথ্য জানিয়েছে।
দলীয় সূত্রগুলো জানায়, দলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা আগামী ডিসেম্বরে। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী মূল্যায়নে এককভাবে নির্বাচন করা, প্রার্থী বাছাই, স্থানীয় পর্যায়ে কর্মীদের নিষ্ক্রিয়তাসহ কয়েকটি সাংগঠনিক দুর্বলতা উঠে আসে। এ প্রেক্ষাপটে দলটি নেতৃত্বে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে দলটি সাংগঠনিক পুনর্গঠনের কাজ দ্রুত শেষ করে নতুন নেতৃত্বকে মাঠে নামাতে চায়।
সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী পর্যালোচনায় দলের মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও দলীয় মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর কেন্দ্রীয় কমিটির পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। ছয় মাস অপেক্ষা করলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতিতে দেরি হয়ে যাবে। সে কারণে মজলিশে শুরার বৈঠকে কমিটি পুনর্গঠনের এজেন্ডা তোলা হবে। মজলিশে শুরার সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে দলের আমির এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।
আগামীকাল ২৭ জুন ২০২৬, শনিবার দুপুরে রাজধানীর পুরানা পল্টনের একটি রেস্টুরেন্টে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মজলিশে শুরার বৈঠক হবে।
দলীয় সূত্র জানায়, এ বৈঠকেই বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্তির প্রস্তাব উত্থাপন এবং নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি অনুমোদনের সম্ভাবনা রয়েছে। সেখান থেকে নায়েবে আমির, মহাসচিব, যুগ্ম মহাসচিব, সহকারী মহাসচিবসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে নতুন দায়িত্বশীলদের নামও ঘোষণা করা হতে পারে।
দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ দুই বছর। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১১ ডিসেম্বর প্রেসিডিয়াম, উপদেষ্টা পরিষদ ও মজলিশে আমেলা পুনর্গঠন করা হয়েছিল। সে হিসাবে বর্তমান কমিটির মেয়াদ আছে ছয় মাস। তবে দলের গঠনতন্ত্রের ১১ ধারায় আমীরকে নির্ধারিত সময়ের আগেই কমিটি পুনর্গঠনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান গতকাল বৃহস্পতিবার জানান, সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী পর্যালোচনায় দলের মধ্যে পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। ছয় মাস অপেক্ষা করলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতিতে দেরি হয়ে যাবে। সে কারণে মজলিশে শুরার বৈঠকে কমিটি পুনর্গঠনের এজেন্ডা তোলা হবে। মজলিশে শুরার সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতে দলের আমির এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে মহাসচিব পদে আছেন মাওলানা ইউনুছ আহমাদ। এই পদে পরিবর্তন আসতে পারে। ২০০৮ সাল থেকে টানা মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন ইউনুছ আহমাদ। দলীয় সূত্র বলছে, নতুন মহাসচিব হিসেবে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমানের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আছে। আবার যুগ্ম মহাসচিবদের মধ্য থেকে অন্য কাউকেও এই দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইউনুছ আহমাদকে উপদেষ্টা পরিষদ বা প্রেসিডিয়ামে নেওয়ার সম্ভাবনা আছে।
প্রেসিডিয়াম ও উপদেষ্টা পরিষদেও নতুন মুখ আসতে পারে। এ ছাড়া সচিব পর্যায়ে অপেক্ষাকৃত তরুণ ও নির্বাচনে সক্রিয় ভূমিকা রাখা নেতাদের সামনে আনার বিষয়ে আলোচনা চলছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।
দলীয় নেতারা বলছেন, পুনর্গঠনের লক্ষ্য শুধু নেতৃত্বে পরিবর্তন নয়; বরং সংগঠনকে আরও কার্যকর নির্বাচনী রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা।
নির্বাচনী মূল্যায়ন থেকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ
হাতপাখা প্রতীক নিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেয় ইসলামী আন্দোলন। এই নির্বাচনে মোট প্রাপ্ত ভোটে প্রায় ২ দশমিক ৭০ শতাংশ পায় দলটি। তারা বরগুনা ১ এর একটি আসনে জয়ী হয়।
নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে দলটির অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা, নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতার ঘাটতি, জনসমর্থনকে ভোটে রূপান্তরের দুর্বলতা উঠে এসেছে বলে দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে দুই বড় রাজনৈতিক ধারার বাইরে থেকে প্রায় ২২ লাখ ভোট পাওয়া এবং প্রায় ৩ শতাংশ ভোটারের সমর্থন অর্জনকে দলটি নিজেদের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য সম্ভাবনার ভিত্তি হিসেবে দেখছে।
এই মূল্যায়নের ভিত্তিতে তরুণ, নারী ও পেশাজীবীদের মধ্যে সাংগঠনিক বিস্তার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে দলটি; পাশাপাশি তারা ছাত্র ও যুবসংগঠনের কার্যক্রম আরও সক্রিয় করাসহ নেতৃত্বকে নির্বাচনী রাজনীতিতে দক্ষ করে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
দলীয় নেতারা বলছেন, পুনর্গঠনের লক্ষ্য শুধু নেতৃত্বে পরিবর্তন নয়; বরং সংগঠনকে আরও কার্যকর নির্বাচনী রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা। ইসলামী আন্দোলন এখন স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রমনির্ভর সংগঠনের গণ্ডি পেরিয়ে আরও সক্রিয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চায়। সে জন্য নেতা-কর্মীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা বাড়ানোসহ নির্বাচনী রাজনীতিতে দক্ষ করে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দলীয় সূত্রগুলোর ভাষ্য, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের কাজ দ্রুত শেষ করতে চায় ইসলামী আন্দোলন। এই পুনর্গঠনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব উঠে আসবে। তারা নির্বাচনী রাজনীতিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখবে। এ কারণেই মেয়াদ শেষ হওয়ার ছয় মাস আগেই কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে নতুন নেতৃত্ব আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় প্রচার ও দাওয়াহ সম্পাদক শেখ ফজলুল করীম মারুফ আজ শুক্রবার দুপুরে জানান, ‘আমাদের লক্ষ্য অবশ্যই নির্বাচনী রাজনীতিতে ভালো করা। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে একটি প্রেশার গ্রুপ (চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী) থেকে সত্যিকার অর্থে পলিটিক্যাল পার্টি (রাজনৈতিক দল) হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। এরই অংশ হিসেবে দলকে নির্বাচনী রাজনীতির জন্য উপযোগী করে তোলার চেষ্টা চলছে।

