
আবদুর রহমান
বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণে নির্মিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ইতিহাসকে সত্যনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে সংরক্ষণ করা না গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম প্রকৃত ইতিহাস থেকে বঞ্চিত হবে। তাই শহীদদের আত্মত্যাগ, আহতদের সাক্ষ্য, গণঅভ্যুত্থানের দলিল-প্রমাণ ও গণমানুষের সংগ্রামের ইতিহাস রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণ করা সময়ের দাবি।
বুধবার (৫ আগস্ট) সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে নবনির্মিত জাদুঘরের স্মৃতিফলক উন্মোচনের মাধ্যমে এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে ফাতেহা পাঠ, দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নেন তিনি।
উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারি ও প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন। সেখানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগ, গণআন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার নির্যাতন-নিপীড়নের বিভিন্ন আলোকচিত্র, দলিলপত্র, স্মারক, ভিডিওচিত্র ও ঐতিহাসিক নিদর্শন পরিদর্শন করেন।
এ সময় অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং প্রধানমন্ত্রীর কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, শহীদ পরিবারের সদস্য ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ, গণমানুষের অংশগ্রহণ এবং বিজয়ের ইতিহাসভিত্তিক একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। পরে ‘জুলাই ৩৬’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ জনগণের সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, বেদনা, সাহস ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে জাতীয় স্মৃতিতে স্থায়ীভাবে ধারণ করার একটি ঐতিহাসিক উদ্যোগ।
তিনি বলেন, এই জাদুঘর শুধু ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মারক হিসেবেই নয়, বরং বাংলাদেশের দীর্ঘ গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার ধারাবাহিক ইতিহাস তুলে ধরার একটি নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—বিতাড়িত ফ্যাসিবাদী শক্তি কখনোই দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে মেনে নেয়নি। তিনি বলেন, তাদের পূর্বসূরিরা ১৯৭৫ সালে সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছিল। পরে স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। এসব ঐতিহাসিক সত্যও জাদুঘরে যথাযথভাবে সংরক্ষিত হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করবে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, শহীদদের জীবনকথা, আহতদের সাক্ষ্য, আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের অভিজ্ঞতা, দলিলপত্র, আলোকচিত্র, ভিডিওচিত্র, শিল্পকর্ম এবং সংশ্লিষ্ট সব ঐতিহাসিক উপাদান সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে দেশি-বিদেশি গবেষক ও নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সংঘটিত প্রতিটি অপরাধের বিচার আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে সম্পন্ন করা হবে। একই সঙ্গে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ, আহত জুলাই যোদ্ধাদের চিকিৎসা ও কল্যাণ নিশ্চিত করে শহীদদের স্বপ্নের স্বনির্ভর, সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
গণঅভ্যুত্থানে জনগণের পাশে অবস্থান নেওয়ায় সেনাবাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ আর কখনো কোনো তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হবে না।
আলোচনা সভা শেষে দেশের খ্যাতনামা শিল্পীদের অংশগ্রহণে পরিবেশিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন প্রধানমন্ত্রী ও আমন্ত্রিত অতিথিরা।

