
রবিউল ইসলাম
নামিদামি দেশি-বিদেশি কোম্পানির ব্র্যান্ড ও মোড়ক ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছিল নকল ফুড সাপ্লিমেন্ট, ওজন বৃদ্ধির ট্যাবলেট, সিরাপ, ক্যাপসুল, তেলসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য। বাইরে থেকে দেখে আসল ও নকল পণ্য চেনার উপায় ছিল না। রাজশাহীর বাঘা উপজেলার নির্জন এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গোপনে পরিচালিত হচ্ছিল এমনই একটি নকল পণ্য তৈরির কারখানা। অবশেষে অভিযান চালিয়ে কারখানাটির সন্ধান পায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। জব্দ করা বিপুল পরিমাণ নকল পণ্য আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত বাঘা উপজেলার আড়ানী-বাঘা সড়কের ফায়ার সার্ভিস স্টেশনসংলগ্ন চক বাউসা মাঠ এলাকায় এ অভিযান পরিচালিত হয়। রাজধানীর বনানী থানায় একটি নামিদামি কোম্পানির করা অভিযোগের ভিত্তিতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) একটি দল স্থানীয় প্রশাসন, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও বাঘা থানা-পুলিশের সহযোগিতায় এ অভিযান চালায়।
অভিযানে কারখানার ভেতরে প্রবেশ করে দেখা যায়, সারি সারি কার্টন ও প্যাকেটে সাজানো বিভিন্ন ধরনের পণ্য। সেখানে ওজন বৃদ্ধির ট্যাবলেট, সিরাপ, হারবাল ফুড সাপ্লিমেন্ট, কফি, তেলসহ নানা ধরনের পণ্য তৈরি ও প্যাকেটজাত করা হচ্ছিল। কারখানায় ছিল ট্যাবলেট তৈরির যন্ত্রসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম। প্রায় ১১ জন কর্মী নিয়ে চলছিল উৎপাদন ও প্যাকেটজাতকরণের কাজ। কারখানার অন্য একটি কক্ষে অনলাইনে পণ্য বিক্রির অর্ডার সংগ্রহ ও সরবরাহের প্রস্তুতিও চলছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ‘Organic Nutrition Ltd.’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ‘কারকুমা জয়েন্ট গার্ড’ পণ্য নকল করে বাজারজাত করার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে রাজধানীর বনানী থানায় লিখিত অভিযোগ করা হয়। ওই অভিযোগের সূত্র ধরে তথ্য বিশ্লেষণ করে বাঘার তেঁথুলিয়া মাঠ এলাকায় নকল পণ্য তৈরির কারখানাটির সন্ধান পায় পুলিশ।
কারখানায় পাওয়া বিভিন্ন পণ্যের মোড়কে যুক্তরাজ্য, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করা হয়েছিল। অথচ পণ্যগুলো স্থানীয়ভাবে তৈরি করা হচ্ছিল বলে জানা গেছে। এতে বিদেশি ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করে ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণার বিষয়টি সামনে এসেছে।
অভিযানে বনানী থানার মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তিকে আটক করে ডিএমপি দল। আটক ব্যক্তিরা হলো: নাটোর জেলার মধ্যে নাটোর সদর থানাধীন লক্ষ্মীপুর খোলাবাড়িয়া গ্রামের মহরম আলীর ছেলে সুমন মিয়া (৩৯) এবং একই গ্রামের নুরুল ইসলাম এর ছেলে নূর আলম (৩৩)।
কর্মচারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৭-৮ মাস আগে বাঘা উপজেলার চক বাউসা গ্রামের রফিকুল ইসলাম এর ছেলে হাইদার আলীর নবনির্মিত বাড়িটি ভাড়া নেন নাটোর সদর থানা এলাকার সেলিম, সাব্বির, কাশেম ও রাজু নামের চারজন ব্যাক্তি। কিন্তুু ট্রেড লাইসেন্স এর তথ্য ভিন্ন। সেখানে একক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান নাটোর ভেষজ মার্ট।
প্রতিষ্ঠানটির ঠিকানা ব্যাবহার করা হয়েছে খোলাবাড়িয়া নাটোর সদর। মালিকানায় রয়েছে খোলাবাড়িয়া গ্রামের হযরত আলীর ও রেশমা বেগম দম্পত্তির পুত্র রেজাউল ইসলাম।
অভিযানের সময় বাঘা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নুসরাত জাহান অনন্যা উপস্থিত ছিলেন। তিনি জানান, কারখানায় বিপুল পরিমাণ নকল ফুড সাপ্লিমেন্ট ও তৈরির সরঞ্জাম পাওয়া গেছে। প্রাথমিক হিসাবে জব্দ করা পণ্যের মূল্য প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি টাকা। এ সময় কারখানায় কর্মরত খালিদ হাসান (৩২), রমজান আলী (২৪), হাসমত আলী (৩৩) ও আরিফুল ইসলাম (২৭) এই চার জনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানার অর্থ তাৎক্ষণিক আদায় করা হয় এবং কারখানাটি সিলগালা করা হয়। আটক বাকি কয়েকজনের মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্কদের মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের রাজশাহী জেলার তত্ত্বাবধায়ক মেহেদী আফজাল বলেন, বিদেশি নামিদামি কোম্পানির ব্র্যান্ড নকল করে এখানে ফুড সাপ্লিমেন্ট তৈরি করা হচ্ছিল। এসব পণ্যের দাম দুই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
পরে বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নুসরাত জাহান অনন্যা ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে জব্দ করা বিপুল পরিমাণ নকল পণ্য আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়। প্রায় দুই ট্রাক পণ্য ঘটনাস্থলেই পুড়িয়ে ফেলা হয়। এ ছাড়া পণ্য তৈরির একটি ভারী যন্ত্র অকেজো করা হয়।
এদিকে, দীর্ঘদিন ধরে জনশূন্য এলাকায় ভাড়া বাসায় এমন একটি কারখানা কীভাবে পরিচালিত হচ্ছিল, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারখানাটির সঙ্গে আরও কারা জড়িত, দেশের বিভিন্ন এলাকায় কত পরিমাণ নকল পণ্য সরবরাহ করা হয়েছে এবং এসব পণ্য ব্যবহার করে কত মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন – তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
নকল ওষুধ ও ফুড সাপ্লিমেন্টের এমন কারবার শুধু ভোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণাই নয়, জনস্বাস্থ্যের জন্যও মারাত্মক হুমকি। তাই এ চক্রের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি উঠেছে।

