
আবদুর রহমান
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবার ঢুকে পড়ল নতুন বিপজ্জনক অধ্যায়ে। ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ইরান-সমর্থিত হুতি বাহিনী। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরাক থেকে ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন। হামলার পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পাইপলাইনটি বন্ধ করে দিয়েছে রিয়াদ। পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত করে ইরাকের এক আঞ্চলিক সামরিক কমান্ডারকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
একদিকে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ উপকূল হুতিদের নিয়ন্ত্রণে, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমে আসা এবং সৌদি তেল অবকাঠামোয় হামলা—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করছে।
শুক্রবার ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে দ্রুত অগ্রসর হয়ে লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করে হুতিরা। কৌশলগত এই উপকূলের অবস্থান বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছাকাছি হওয়ায় আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে পরিচিত এই নৌপথে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়তে পারে।
তবে হুতিদের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচলে কোনো হুমকি নেই বলে দাবি করা হয়েছে। বাস্তবে তাদের সামরিক অগ্রযাত্রা এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের কাছাকাছি অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।
এর মধ্যেই সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, ইরাক থেকে উৎক্ষেপিত ড্রোন হামলার পর সম্ভাব্য ঝুঁকি এড়াতে পাইপলাইনটির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। তাৎক্ষণিক সামরিক প্রতিক্রিয়ায় না গিয়ে রিয়াদ ইরাকি কর্তৃপক্ষকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দিয়েছে।
সৌদির জন্য এই পাইপলাইন কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে লোহিত সাগরের মাধ্যমে তেল পরিবহনের সুযোগ থাকায় এটি দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রপ্তানি পথ। ফলে পাইপলাইন বন্ধ হওয়ার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ড্রোন হামলার উৎস ইরাকে নিশ্চিত হওয়ার পর বাগদাদও ব্যবস্থা নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি ঘটনার তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক আঞ্চলিক সামরিক কমান্ডারকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। হামলার সঙ্গে কারা জড়িত, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
যুদ্ধের অভিঘাত ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালিতেও স্পষ্ট। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অপরিশোধিত তেলের দামও বেড়েছে। দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেখা দিলে পরিবহন ব্যয় থেকে শুরু করে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম পর্যন্ত এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক তৎপরতাও শুরু হয়েছে। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও নৌ চলাচল নিয়ে আলোচনা করতে আগামী সোমবার ওমানে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বসবে ইরান। তেহরানের দাবি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আলোচনার অন্যতম লক্ষ্য।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এখন তাই কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের সংঘাত নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুটি নৌপথ, তেল সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য। লোহিত সাগর থেকে হরমুজ—দুই দিকেই সংকট ঘনীভূত হওয়ায় যুদ্ধের পরবর্তী বিস্তার নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা।

